ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ পনেরো বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল অনুমোদন করেছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সমর্থিত এই প্রস্তাবকে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার নিম্নকক্ষে বিলটির মূল ধারাগুলো নিয়ে আলোচনা শেষে ভোটাভুটিতে ১১৬ জন সংসদ সদস্য এর পক্ষে এবং ২৩ জন বিপক্ষে ভোট দেন। এখন বিলটি অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষ সিনেটে পাঠানো হবে।
বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হলে পনেরো বছরের নিচের কিশোর-কিশোরীরা স্ন্যাপচ্যাট, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না।
জাতীয় পরিষদে বিলটি পাস হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট মাখোঁ একে একটি বড় অগ্রগতি বলে মন্তব্য করেন। তিনি সরকারকে দ্রুত পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই যেন এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা যায়। ফ্রান্সে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় সেপ্টেম্বরের শুরুতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, আমাদের শিশুদের মস্তিষ্ক বিক্রির পণ্য নয়।
বিলটির উদ্যোক্তা সংসদ সদস্য লর মিলার বলেছেন, এই আইন সমাজে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দেবে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্ষতিকর নয়—এই ধারণা সঠিক নয়।
তার মতে, এসব মাধ্যম মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। তথ্য দেওয়ার কথা বলে তথ্যের ভারে মানুষকে চাপা দিয়েছে, বিনোদনের কথা বলে মানুষকে একঘরে করে তুলেছে।
গত মাসে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ মন্তব্য করেছিলেন, শিশুদের মানসিক ও আবেগগত স্বাস্থ্যের দায়িত্ব শুধু মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
প্রস্তাবিত আইনে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা ক্ষতিকর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি তালিকা তৈরি করবে। এই তালিকাভুক্ত প্ল্যাটফর্মগুলো পনেরো বছরের নিচে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর কিছু মাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও সেক্ষেত্রে অভিভাবকের স্পষ্ট অনুমতি প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া বিলের আরেকটি ধারায় উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। এর আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল।
আইনটি কার্যকর করতে বয়স যাচাইয়ের একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অনলাইন পর্নোগ্রাফি ব্যবহারে বয়স প্রমাণের যে পদ্ধতি চালু রয়েছে, তার মতো একটি কাঠামোই এখানে বিবেচনায় আসতে পারে।
ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশও শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা ভাবছে। ডেনমার্ক, গ্রিস, স্পেন ও আয়ারল্যান্ড এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যেও ষোলো বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার বিষয়ে পরামর্শ প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।
এই বিলের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গত বছর সংসদীয় এক তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে, যেখানে টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মানসিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়।
সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেকটাই সীমিত ভূমিকা রাখতে পারছেন। সে প্রেক্ষাপটে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা জনসমর্থন পাওয়ার একটি বিরল সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিলটি আগামী এক মাসের মধ্যেই সিনেটে অনুমোদন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার দ্রুত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনাও করছে, যাতে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই আইনটি কার্যকর করা যায়।
















