বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের অবস্থান অটুট থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই আধিপত্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক দেশ এখন পারস্পরিক বাণিজ্যে ডলারের বিকল্প খুঁজছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে জি-২০ সম্মেলনের ঠিক আগে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের এক বৈঠকে নতুন একটি পেমেন্ট ব্যবস্থার উদ্বোধন করা হয়। এর মাধ্যমে আফ্রিকার বড় ব্যাংকগুলো চীনের আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে, ফলে ডলার ব্যবহার না করেই ইউয়ানে বাণিজ্য নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং আজও বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট ব্রিকসের নেতৃত্বে বিকল্প ব্যবস্থার আলোচনা জোরদার হয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি নতুন কয়েকটি দেশ এই জোটে যুক্ত হয়েছে।
চীন ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার বাড়িয়েছে। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রুপি ও দিরহামে লেনদেন করছে, আবার চীন ও রাশিয়া স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়িয়েছে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল হিসেবে। ব্রিকস দেশগুলো একটি যৌথ ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার দিকেও এগোচ্ছে, যা কার্যকর হলে ডলার ও পশ্চিমা আর্থিক নেটওয়ার্ক এড়িয়ে লেনদেন সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নতুন কিছু নয়, তবে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রণোদনা এখন অনেক বেশি। ডলারে লেনদেন করলে যে অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে যায়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।
তবে বাস্তবতার দিক থেকে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সব দেশের মুদ্রা সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক অবকাঠামো না থাকলে এই ব্যবস্থার বিস্তার কঠিন। এখনও বৈশ্বিক লেনদেনের বড় অংশ ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় এবং চীনের মুদ্রার অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
তবুও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বর্ণ ও রুপার দাম বাড়া ডলারের ওপর আস্থার কিছুটা ঘাটতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও এই সন্দেহকে বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে, নিকট ভবিষ্যতে ডলারের জায়গা পুরোপুরি হারানোর সম্ভাবনা নেই। তেলের মূল্য নির্ধারণসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে ডলারই এখনো প্রধান মানদণ্ড। তবে অনেক দেশ আর এককভাবে ডলারের ওপর নির্ভর করতে চায় না, বরং বিকল্প ও বৈচিত্র্যময় ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে যদি কখনো ডলারের প্রকৃত বিকল্প উঠে আসে, তাহলে সেটি চীনের ইউয়ান হতে পারে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে যদি তেল বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়, তাহলে বৈশ্বিক মুদ্রা কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ডলারের অবস্থান এখনও শক্তিশালী থাকলেও ধীরে ধীরে তার প্রভাব ক্ষয় হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। এটি হঠাৎ পতন নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা একটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
















