কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে কেন্দ্র করে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা দ্রুত ব্যবসার জগতে জায়গা করে নিচ্ছেন। যুক্তরাজ্যে জেন জেড প্রজন্মের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ বাড়ছে, আর প্রযুক্তির সঙ্গে সহজাত পরিচিতি তাদের এই যাত্রাকে আরও এগিয়ে দিচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা আরনাউ আয়েরবে ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার আগেই একটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এআই প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পান। কিন্তু করপোরেট জীবনে নিজেকে সীমাবদ্ধ মনে হওয়ায় তিনি সেই পথ ছেড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। একই অনুভূতি ছিল তার স্কুলজীবনের বন্ধু পাবলো হিমেনেস দে পার্গা রামোসেরও, যিনি স্নাতক শেষে একটি করপোরেট চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন।
২০২৩ সালে তারা আরেক বন্ধু বার্গেন মেরের সঙ্গে মিলে লন্ডনে থ্রক্সি নামে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠান বিক্রয় টিমের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল সহকারী তৈরি করে। বর্তমানে ২৪ বছর বয়সী এই তিন উদ্যোক্তা দুই দফায় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় পঞ্চাশ লাখ পাউন্ড তহবিল সংগ্রহ করেছেন এবং তাদের বার্ষিক বিক্রি প্রায় বারো লাখ পাউন্ডে পৌঁছেছে।
এই তিনজন তরুণ উদ্যোক্তা এমন একটি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা নিজের ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, জেন জেড প্রজন্মের বড় একটি অংশ ভবিষ্যতে নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলতে চায়। সরকারি সহায়তাভিত্তিক ঋণ কর্মসূচির তথ্যেও দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য দেওয়া ঋণের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়। থ্রক্সির প্রতিষ্ঠাতারা জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময়ের কাজের সংস্কৃতি নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতে হয়। আরনাউ আয়েরবে বলেন, এত পরিশ্রমের কথা আগে জানলে হয়তো তিনি শুরুই করতেন না।
তাদের মতে, সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এআইয়ের সঙ্গে সহজাত পরিচিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথমিক সংস্করণ নিয়ে কাজ করেছেন, যা তাদের কাছে ছিল প্রায় জাদুর মতো অভিজ্ঞতা। তারা বিশ্বাস করেন, এআই মানুষের কাজের ধরন আমূল বদলে দেবে।
বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে সবচেয়ে সফল স্টার্টআপগুলো এখন ক্রমেই কম বয়সী উদ্যোক্তাদের হাত ধরে গড়ে উঠছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের এআই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাদের গড় বয়স গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে বয়স কম হওয়ায় অনেক সময় তরুণ উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। লন্ডনের উদ্যোক্তা রোজি স্কুসের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ার শুরুর দিকে তাকে প্রায়ই সহকারী ভেবে ভুল করা হতো। পরে কথা বলার পর মানুষ বুঝতে পারত যে তিনিই প্রতিষ্ঠানের প্রধান।
বর্তমানে ২৯ বছর বয়সী রোজি স্কুস একটি সংগীত ও বিনোদন সংস্থার প্রধান নির্বাহী। বিলাসবহুল হোটেল ও ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো এক মিলিয়ন পাউন্ড আয় করে এবং ২০২৫ সালে তাদের মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ষোল লাখ পাউন্ড।
তিনি বলেন, ব্যবসা শিক্ষার কোনো আনুষ্ঠানিক পটভূমি ছাড়াই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখে নিতে হয়েছে। তরুণ বয়সে প্রতিষ্ঠান গড়া যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি তা নতুনত্ব ও স্মরণীয়তার সুবিধাও দেয়।
তবে অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা তরুণদের সতর্ক করে দিচ্ছেন। অনেকের মতে, দ্রুত আয় বাড়ানোই শেষ কথা নয়, বরং টেকসইভাবে ব্যবসা বড় করাই আসল চ্যালেঞ্জ। কেউ কেউ মনে করেন, খুব কম বয়সে ব্যবসা শুরু করলে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স কম হলে সেই নেটওয়ার্ক তৈরি করা কঠিন হয়। তাই তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অভিজ্ঞ পরামর্শদাতা ও সহযোগীদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া দীর্ঘমেয়াদে সফলতার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে।
















