ঢাকা, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা বর্তমানে সরকারের, বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের, অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। এটি একই সাথে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য ইতিহাস সৃষ্টির এক সন্ধিক্ষণ। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর জন্য একদিকে এটি কঠিন পরীক্ষা, অন্যদিকে সফলতার মাধ্যমে ভাবমূর্তিকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ। নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে গোটা জাতি।
কথার কথা নয়, আসছে ফেব্রুয়ারির সেই আয়োজনকে কেন্দ্র করেই চলছে নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। এই নির্বাচনী প্রস্তুতির মাঝেই চলছে সেনাবাহিনীকে বিরক্ত ও বিব্রত করার এক পরিকল্পিত অপচেষ্টা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই উদ্দেশ্যবাদীরা কিঞ্চিৎ সফলও হয়েছে। র্যাব এবং ডিজিএফআইতে ডেপুটেশনে থাকা কিছু সেনা কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগে সেনাবাহিনীকে একটি সাময়িক ধাক্কা খেতে হয়েছে।
সেনা সদর অবশ্য তাৎক্ষণিক বক্তব্য ও ব্যাখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং প্রয়োজনীয় জবাব দিয়েছে। যে সময়ে সেনা সম্পৃক্ততায় একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা তুঙ্গে ছিল, ঠিক সেই সময়ই এই ধাক্কাটি এলো, যা বিশেষ মহলকে উল্লসিত করেছে।
তবে তাদের এই উল্লাস স্থায়ী হওয়ার সুযোগ কম। দুর্যোগ-দুর্বিপাকসহ জাতীয় নানা প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা করার দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল। অথচ এই ভরসার বিপরীতেই সেনাবাহিনী নিয়ে অবান্তর কথা ও আজেবাজে গুজব ছড়ানোর প্রবণতাও বাংলাদেশে লক্ষ্যণীয়। আরোপিত দোষারোপ, উড়িয়ে দেওয়া বা বিলুপ্ত করে দেওয়ার মতো কথা বলে যারা এতদিন ঝিম মেরে ছিল, সেই মহলটি আবারও সক্রিয়।
তাই সেনাবাহিনী নিয়ে আবারও তাদের আচানক-আজগুবি গুজবের হাট বসেছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই চক্রটি বেশি তেজোদ্দীপ্ত। প্রায় প্রতিদিনই সেনাবাহিনী সম্পর্কে কোনো না কোনো গুজববটিকা ছাড়া হচ্ছে। কখনো সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর, কখনো প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সেনাপ্রধানের, বা সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাঁর অধস্তনদের কল্পিত বিরোধের কিচ্ছা ছড়ানো হচ্ছে মুখরোচক করে।
আসন্ন নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি মহা দায়িত্ব। নির্বাচনের মুখ্য দায়িত্ব ইসির হলেও এটি কেবল তাদের একার নয়; এখানে প্রার্থী, ভোটার, রাজনৈতিক দল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অংশীজন অনেকেই। ইসি অনেকটা রেফারির মতো, আর আম্পায়ারিংয়ের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাস্তবতা হলো, পুলিশ এখনো ট্রমাগ্রস্ত। গেল সরকার আমলে নানা ক্রিয়াকর্মের ফলে পুলিশ জন-আস্থা হারিয়েছিল, সেই জায়গা থেকে তারা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর বিপরীতে, সেনাবাহিনী জনগণের কাছে আরও ভরসা ও আস্থার জায়গায় চলে এসেছে। কাজের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর এই অবস্থানে উত্তীর্ণ হয়ে আসা বিশেষ মহলটির কাছে সহ্য না হওয়াই স্বাভাবিক।
আগের সরকার নির্বাচনকালীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে খারিজ করে দিয়েছিল। এবার আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশন ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২’ সংশোধন করে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। জনগণের বিশ্বাস, নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালনে সুফল আসবে। এই বিশ্বাস থেকেই ২০০১ সালে আরপিও সংশোধন করা হয়েছিল।
মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে—এই প্রত্যাশা ও নিশ্চয়তা গণতন্ত্রকামী সকলের জন্যই অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত। তাই নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। আন্তর্জাতিক মহলও আশা করে, আমাদের আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে। এছাড়া, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের অভিপ্রায় সেই আশাবাদে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কোনো ব্যত্যয় না ঘটলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নেবে অন্তর্বর্তী সরকার—এই অপেক্ষায় আছে ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী মানুষ। এমন আগ্রহ ও আশাবাদ বরবাদ করতেই আগেভাগেই সেনাবাহিনীকে বিরক্ত ও জনগণের মুখোমুখি করার এজেন্ডা নেওয়া হয়েছে।
সামনের নির্বাচনকে ঐতিহাসিক, প্রশ্নমুক্ত ও অবাধ করতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিকল্প নেই। আইন-শৃঙ্খলার প্রতীক বলতে মানুষের সবার আগে চোখ গেলেও, পুলিশের বর্তমান অবস্থা আর ব্যাখ্যা করে বলার দরকার নেই। সেখানে বিশেষ ভরসা সশস্ত্র বাহিনী। তারা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে আছে বলেই জননিরাপত্তা আজকের অবস্থায় রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের সময়ও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়েই তারা মাঠে থাকবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে আগের চেয়েও বেশি ভূমিকা রেখে তারা নিজেদের ভাবমূর্তিকে আরও শাণিত করতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর সরকার এবার ১৯৯১ সালের সুষ্ঠু নির্বাচনের মানদণ্ডে আরও ব্যতিক্রম আনার নজির গড়তে চান, যেখানে অন্যতম ভরসা সেনাবাহিনী। এই চেষ্টা আঁচ করতে পেরেই এখন থেকে সেনাবাহিনীকে টার্গেট করেছে একটি মহল। তারা কোনোক্রমেই তা হতে দিতে চায় না। সেনাবাহিনীকে টার্গেট করে তাদের মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচনকে ভেজালে ফেলে দেওয়া।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশপ্রেমের সারথি হয়ে জনতার কাতারে শামিল হয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা দেওয়া, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং বিভিন্ন অপরাধী গ্রেপ্তারে সেনাবাহিনী যে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে, তা প্রতিটিই এক-একটি সফল পরীক্ষার মতো। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্য, “আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নতুন সরকার দেখতে চাই,” সেই ওয়াদা বাস্তবায়নের পর্বই হচ্ছে আগামী নির্বাচন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান স্পষ্ট করার নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে। নির্বাচনেও সশস্ত্র বাহিনীর সম্পৃক্ততায় দেশের নতুন যাত্রা শুরুর অপেক্ষায় আছে গণতন্ত্রমনা মানুষ। এই স্বপ্ন বরবাদের অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই সেনাবাহিনীকে বিব্রত, বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করতে অবিরাম ঢিল ছোড়া হচ্ছে। সেই সব ঢিল কেবল প্রতিহত করাই নয়, নিজেদের ইমেজকে আরও উচ্চতায় নেওয়ার সুযোগ ও সামর্থ্য উভয়ই সেনাবাহিনীর রয়েছে। আর সেটির বিশেষ উপলক্ষ হলো কাঙ্ক্ষিত-প্রত্যাশিত সুষ্ঠু নির্বাচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
















