ঢাকা | ১৮ অক্টোবর ২০২৫
চীনের বিনিয়োগে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন করে গতি পাচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে শিল্প, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে চীনের অংশগ্রহণ এখন দেশের প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুনভাবে উষ্ণ হয়েছে। বেইজিং ও ঢাকায় সক্রিয় যোগাযোগ এখন “অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব” ছাড়িয়ে “কৌশলগত সহযোগিতার” পর্যায়ে পৌঁছেছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের উদ্যোগে দুই দেশের মধ্যে নীতি ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে “আঞ্চলিক ভারসাম্য” পুনর্নির্মাণে আগ্রহী।
অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রেকর্ড বিনিয়োগ
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য অনুযায়ী, শুধু চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে বর্তমানে ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি কার্যক্রম চালাচ্ছে। সম্প্রতি বেজা চায়না লেসো গ্রুপের কাছে ১২.৫ একর জমি হস্তান্তর করেছে নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য।
২০২৪ সালের শেষে চীনের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বাংলাদেশে ১.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে — দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যা অন্যতম সর্বোচ্চ। গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স, নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতে চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
বেপজার তথ্য অনুযায়ী, চীন এখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ। চট্টগ্রাম, মোংলা, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে চীনা কোম্পানির তৈরি শিল্প কারখানা কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উচ্চপর্যায়ের সফর ও বহুমুখী কূটনীতি
২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফর করেন। সফরে আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল বাণিজ্য ভারসাম্য, ঋণ পুনর্গঠন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর। চীন বাংলাদেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তার আশ্বাস দেয়।
এরপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল — বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে চীন সফরে। এসব সফরে আলোচনার মূল বিষয় ছিল উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময়, রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও বিনিয়োগ সহযোগিতা।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব সফর বাংলাদেশের “বহুমুখী কূটনীতি” নীতির প্রতিফলন। পশ্চিমা প্রভাব ও শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতার বিপরীতে চীনের অ-হস্তক্ষেপমূলক নীতি ঢাকার জন্য এক কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠেছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের অবস্থান
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়, যা বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতির নতুন যুগ সূচিত করে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর আওতায় এখন চীনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প —
- কর্ণফুলী টানেল (দেশের প্রথম সাবমেরিন টানেল),
- ঢাকা–আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে,
- পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প,
- পায়রা ও মৈত্রী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র,
- স্মার্টফোন উৎপাদন,
- ডিজিটাল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ,
- ও নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার।
এসব প্রকল্প শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, নতুন কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও অবদান রাখছে।
সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের সমন্বয় প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের উৎস। রফতানি ঘাটতি, প্রযুক্তি নির্ভরতা ও ঋণ টেকসইতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তবে নীতিগত স্বচ্ছতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিল্প-বান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে পারে।
এক অর্থনীতিবিদ বলেন,
“চীনের বিনিয়োগ কেবল অর্থনীতির গতিপথই বদলাচ্ছে না, এটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকেও নতুন মাত্রা দিচ্ছে।”
চীনের প্রতিশ্রুতি : বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা
ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেন,
“বাংলাদেশ আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। আমরা তাদের উন্নয়ন যাত্রায় অংশীদার হতে চাই — বিনিয়োগ, সংস্কৃতি ও কূটনীতি—সবক্ষেত্রেই।”

তিনি যোগ করেন,
“চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করতে চায়। এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, দুই দেশের জনগণের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বের প্রতীক।”
বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত সম্পর্কের অংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা আঞ্চলিক রাজনীতির ভারসাম্যে নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুশাসন ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা গেলে চীনের সহযোগিতা বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির “মূল চালিকাশক্তি” হয়ে উঠতে পারে।
















