ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আপাতত স্তিমিত হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের পর হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অস্থিরতায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে, তাদের অনেকের ব্যবসা ও সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদের মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কঠোর দমননীতির মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ আপাতত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সাময়িক স্থিতাবস্থার আড়ালেও যেসব ক্ষোভ থেকে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেগুলো এখনো অটুট রয়েছে। ফলে ইরানের সামনে দুটো পথই খোলা আছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা, অথবা কোনো পরিবর্তন না এনে ভবিষ্যতে আরও বড় অস্থিরতার ঝুঁকি নেওয়া।
দুর্বল অর্থনীতি, আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক ক্ষয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক চাপ—এই তিনটি বিষয় ইরানকে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান অবস্থা টেকসই নয় এবং সংস্কার ছাড়া পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই যেতে পারে।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে মুদ্রার ব্যাপক দরপতনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুতই সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থার পতনের দাবিও তোলে। এই আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর অন্যতম সহিংস অধ্যায়।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, সহিংসতায় তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এর আগের বছরগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বা সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর সরকার ভর্তুকি ও কিছু শিথিলতার পথে হেঁটেছিল। কিন্তু এবার সেই সুযোগ সীমিত। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে মুদ্রার মান তলানিতে নেমেছে। তেলের আয় কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে চরমে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ সংকট ও পানির অভাব সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে যেতে হবে। কিন্তু তার জন্য ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা—এই তিন বিষয়ে ছাড় দিতে হতে পারে, যেগুলো এত দিন দেশটির নিরাপত্তা কৌশলের মূল স্তম্ভ ছিল। অতীতে আংশিক পারমাণবিক সীমাবদ্ধতায় সম্মতির নজির থাকলেও অন্য দুটি বিষয়ে ছাড় দেওয়াকে কঠিন মনে করা হচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক যুদ্ধে আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে ইরান তার মিত্র কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে। কিছু অঞ্চলে ছোট গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান সহযোগিতা পুনর্গঠনের কৌশল নিয়ে কাজ চলছে। তবে বিক্ষোভ ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এই নীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিক্ষোভের চূড়ান্ত পর্যায়ে সামরিক হামলার হুমকি দেওয়া হলেও পরে সেই ভাষা কিছুটা নরম হয়েছে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার আগ্রহের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে, যদিও একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো ছাড় দিলে সরকারের নিরাপত্তা ও বৈধতার ধারণা আরও দুর্বল হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের যে নীরব সামাজিক চুক্তি ছিল—নিরাপত্তার বিনিময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা—তা সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেও রূপান্তর শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে ধীরে ধীরে সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব বাড়ছে, বিশেষ করে বিপ্লবী বাহিনীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে ইরানের শাসনব্যবস্থা বর্তমান রূপে নাও থাকতে পারে। সেটা জনগণের নতুন আন্দোলনের মাধ্যমে হোক বা নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতর থেকে ভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করুক—পরিবর্তন যে অনিবার্য, সে বিষয়ে অনেকেই একমত।
















