আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সিরিজ বৈঠক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। এই আগ্রহের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশলগত ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কূটনীতিকদের আগ্রহের প্রধান কারণসমূহ
- ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পূর্বাভাস: ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অনুপস্থিতিতে বিএনপি বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কূটনীতিকরা মনে করছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করার সম্ভাবনা প্রবল। তাই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সরকার প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি বুঝতে তারা আগ্রহী।
- রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা (৩১ দফা): বিএনপি ঘোষিত ‘৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা’ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষ নজরে এসেছে। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে তারেক রহমানের পরিকল্পনাগুলো সরাসরি তাঁর মুখ থেকে শুনতে চাইছেন কূটনীতিকরা।
- স্থিরতা ও সুশাসনের নিশ্চয়তা: দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রবাস থেকে ফিরে তারেক রহমান দলের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছেন এবং উগ্রবাদ বা প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান কী, তা যাচাই করা বিদেশি শক্তিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
- অর্থনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ: চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশগুলো তাদের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। বিশেষ করে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের পৃথক বৈঠকগুলো এই বার্তাই দেয় যে, প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত।
বৈঠকগুলোর পরিসংখ্যান ও অংশগ্রহণকারী:
| পর্যায় | অংশগ্রহণকারী দেশ/সংস্থা | প্রধান আলোচ্য বিষয় |
| সুপার পাওয়ার | যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য। | দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, নির্বাচন ও ভূ-রাজনীতি। |
| আঞ্চলিক শক্তি | ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান। | কানেক্টিভিটি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। |
| ইউরোপীয় ইউনিয়ন | জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, ডেনমার্কসহ ইইউ প্রতিনিধি। | বাণিজ্য, মানবাধিকার ও রোহিঙ্গা সংকট। |
| অন্যান্য প্রভাবশালী | কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড। | বিনিয়োগ, অভিবাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। |
বৈঠক পরবর্তী বার্তা:
“আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। চীন আশা করে তিনি আগামী দিনে দেশের নেতৃত্বে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।”
— ইয়াও ওয়েন, চীনা রাষ্ট্রদূত (৭ জানুয়ারি ২০২৬)
“যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করতে চায়। তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।”
— ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত (১৯ জানুয়ারি ২০২৬)
কূটনৈতিক মূল্যায়ন:
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সঙ্গে এই ধারাবাহিক বৈঠক কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং এটি একটি ‘ডি ফ্যাক্টো’ স্বীকৃতি যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাঁকে বাংলাদেশের আগামীর মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধান, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যু এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করার জন্যই মূলত কূটনীতিকদের এই দৌড়ঝাঁপ।
















