যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের মধ্যে ফেডারেল বাহিনীর গুলিতে আরও এক মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর শহরজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
মিনিয়াপোলিস পুলিশের প্রধান ব্রায়ান ও’হারা সাংবাদিকদের জানান, শনিবার গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে মারা যান সাতত্রিশ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। তিনি নিশ্চিত করেন, নিহত ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন এবং মিনিয়াপোলিসের বাসিন্দা। নিহতের পরিবার তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে জানায়, তাঁর নাম অ্যালেক্স প্রেটি। তিনি একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে কর্মরত একজন নার্স ছিলেন।
এই ঘটনা ঘটে শহরে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান ফেডারেল অভিবাসন অভিযানের প্রেক্ষাপটে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন বিভাগসহ বিভিন্ন ফেডারেল বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। এর আগে সাত জানুয়ারি একই শহরে রেনে গুড নামের সাতত্রিশ বছর বয়সী এক নারী অভিবাসন বিভাগের এক কর্মকর্তার গুলিতে নিহত হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন বিক্ষোভ চলছে। গত সপ্তাহে আলাদা এক ঘটনায় ভেনেজুয়েলার এক নাগরিকও গুলিবিদ্ধ হন।
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজ বলেন, এটি আর অভিবাসন আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং এটি রাজ্যের মানুষের বিরুদ্ধে সংগঠিত সহিংসতার অভিযানে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, এই সহিংসতায় আবারও একটি প্রাণ ঝরেছে এবং এ ঘটনার তদন্ত রাজ্য সরকারই করবে।
স্বদেশ নিরাপত্তা বিভাগ দাবি করেছে, এক সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তা আত্মরক্ষার জন্য গুলি ছোড়েন। বিভাগের মুখপাত্র ট্রিসিয়া ম্যাকলাফলিন বলেন, নিহত ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে কর্মকর্তাদের দিকে এগিয়ে আসেন এবং নিরস্ত্র করার চেষ্টা করলে সহিংস প্রতিরোধ করেন। তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এসব দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিনেসোটা গভর্নর ও মিনিয়াপোলিসের মেয়রের সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন স্থানীয় পুলিশকে অভিবাসন কর্মকর্তাদের সুরক্ষায় ব্যবহার করা হয়নি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব পরিস্থিতি উসকে দিচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, অ্যালেক্স প্রেটি রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ফেডারেল বাহিনীর তৎপরতা ধারণ করছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর ও অন্য বিক্ষোভকারীদের ওপর মরিচ স্প্রে ছোড়া হয়। পরে একাধিক কর্মকর্তা তাঁকে মাটিতে ফেলে মাথা ও শরীরে আঘাত করেন। এরপর কাছ থেকে একাধিক গুলির শব্দ শোনা যায়।
স্বতন্ত্র অনুসন্ধানকারী সংগঠন জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় গুলির আগেই ওই ব্যক্তির কাছ থেকে একটি অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। গুলির বেশির ভাগই ছোড়া হয়, যখন তিনি মাটিতে নিথর অবস্থায় পড়ে ছিলেন।
পুলিশপ্রধান বলেন, নিহত ব্যক্তি বৈধ অস্ত্র বহনের অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন। মিনেসোটা আইনে অনুমতি থাকলে প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন করা যায়।
নিহতের পরিবার এক বিবৃতিতে জানায়, তারা শোকাহত ও ক্ষুব্ধ। তাঁদের ভাষ্য, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের ছেলেকে নিয়ে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা জঘন্য মিথ্যাচার। পরিবারের দাবি, গুলির সময় অ্যালেক্সের হাতে অস্ত্র ছিল না, তিনি মোবাইল ফোন ধারণ করছিলেন এবং অন্য এক নারীকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন।
ঘটনার পর শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে ফেডারেল বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ও বিস্ফোরক শব্দের গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। পরে ফেডারেল বাহিনী এলাকা ত্যাগ করলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়, তবে বিক্ষোভকারীরা দীর্ঘ সময় রাস্তায় অবস্থান করেন।
মেয়র জ্যাকব ফ্রে এই হত্যাকাণ্ডকে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, আর কতজন বাসিন্দা মারা গেলে এই অভিযান বন্ধ হবে—এই প্রশ্নের উত্তর ট্রাম্প প্রশাসনকে দিতে হবে। মিনেসোটার সিনেটর অ্যামি ক্লোবুশার অবিলম্বে রাজ্য থেকে অভিবাসন বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানান। কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর এই ঘটনাকে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করেন এবং মিনিয়াপোলিসকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অভিযোগ তোলেন।
রাজ্য সরকার ও নগর প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত রাখতে জনগণকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
















