বহির্নোঙরে আটকা ৪৫ লাখ টন পণ্য; লাইটার জাহাজ সংকটের নেপথ্যেও ‘অদৃশ্য’ সিন্ডিকেট
আসন্ন রমজান ও পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশজুড়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে শক্তিশালী বাজার সিন্ডিকেট। জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলের সুযোগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার নীল নকশা চূড়ান্ত করেছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। রাজধানীর খুচরা বাজার থেকে চট্টগ্রামের পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জ—সর্বত্রই এখন ঊর্ধ্বমুখী দামের উত্তাপ। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ছোলা ও ডালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ১২ লাখ টন রমজান সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য নিয়ে শতাধিক জাহাজ আটকা পড়লেও লাইটার জাহাজ সংকটের দোহাই দিয়ে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া থমকে দেওয়া হয়েছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার তদারকি সংস্থার নমনীয়তা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই যুগের পর যুগ এই ‘সিন্ডিকেট সংস্কৃতি’ অপরাজিত থেকে যাচ্ছে।
২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | রাত ৯:০০ মিনিট
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা ও চট্টগ্রাম
অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরের শাসনামলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিম, মুরগি ও সবজির বাজারে অস্থিরতার পর এখন রমজানের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বাজারও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
রমজানের অনুষঙ্গ পণ্যে আগাম উত্তাপ
রমজান শুরুর মাসখানেক আগেই পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্যের দামের অস্বাভাবিক চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে:
- পিঁয়াজ ও রসুন: সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৪ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ৩ টাকা বেড়েছে। রসুনের দাম পৌঁছেছে ১৩০ টাকায়।
- ছোলা ও ডাল: ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ ছোলার দাম ৫ টাকা বেড়ে মানভেদে ৭০-৭৫ টাকা এবং ডালের দাম ২-৩ টাকা বেড়েছে।
- তেল ও চিনি: পাইকারি বাজারে প্রতি মণ চিনির দাম ১০০ টাকা এবং পাম অয়েলের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এমনকি সেমাইয়ের মণেও ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম চড়িয়েছে সিন্ডিকেট।
বন্দর ও লাইটার জাহাজ সিন্ডিকেট
বাজার অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে সৃষ্ট জটিলতা: ১. জাহাজ জট: কুতুবদিয়া চ্যানেল ও বহির্নোঙরে বর্তমানে ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য নিয়ে শতাধিক মাদার ভেসেল অপেক্ষমাণ। এর মধ্যে ২০টি জাহাজে রয়েছে প্রায় ১২ লাখ টন রমজানের ভোগ্যপণ্য (ছোলা, ডাল, চিনি ও তেল)। ২. লাইটার সংকট: ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের তথ্য অনুযায়ী, ১০৪টি লাইটার জাহাজের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০টি। অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী চক্র কৃত্রিমভাবে লাইটার জাহাজের সংকট তৈরি করে পণ্য খালাস বিলম্বিত করছে, যাতে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানো যায়।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সরকারি অসহায়ত্ব
কৃষি খাতের জিডিপিতে বড় অবদান থাকলেও কৃষিপণ্যের মুনাফার ৮০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ফড়িয়া ও আড়তদারদের পকেটে।
- উৎপাদক বনাম ভোক্তা: কৃষক নামমাত্র মূল্যে পণ্য বিক্রি করলেও ভোক্তা পর্যায়ে তা পৌঁছাতে দাম বেড়ে তিনগুণ হচ্ছে।
- আইনের প্রয়োগহীনতা: মজুতদারি ও অতিরিক্ত মুনাফা রোধে কঠোর আইন থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তা সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলতে ব্যর্থ হচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচন ও রমজানের চ্যালেঞ্জ
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পরপরই রমজান শুরু হওয়ায় প্রশাসনের পূর্ণ মনোযোগ ভোটের দিকে থাকার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এখনই যদি শক্ত হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে বাজারে বড় ধরনের অরাজকতা তৈরি হতে পারে, যা সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দেবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে কেবল জরিমানা নয়, বরং রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং পণ্য পরিবহন ও খালাস প্রক্রিয়াকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
















