দীর্ঘ বছর লিবিয়ায় বসবাসের পর ১৫২ জন সিরীয় ও ৩০৯ জন বাংলাদেশি নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন কর্মসূচির আওতায়।
আইওএম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সিরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সংস্থাটি ৯ অক্টোবর লিবিয়া থেকে ১৫২ জন সিরীয় নাগরিককে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে। ত্রিপোলি থেকে রওনা দেওয়া এসব যাত্রী ছিলেন মূলত পরিবারভিত্তিক, যারা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লিবিয়ায় বসবাস করছিলেন। যাত্রার আগে তাদের আইওএম-এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়।
সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদেরকে আলেপ্পো, হামা ও হোমসসহ নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গ্রহণ ও পরিবহন সহায়তা দেওয়া হয়।
আইওএম জানিয়েছে, জুলাই মাসে সিরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দামেস্কে আইওএমের কার্যক্রম পুনরায় চালুর অনুমোদন দিয়েছে। এরপর সংস্থাটি দেশজুড়ে মানবিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
আইওএম মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক উসমান বেলবাইসি বলেন, “সিরিয়ার পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় সহায়তা ও অভ্যন্তরীণ বা বিদেশফেরত নাগরিকদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
আইওএম স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ফেরত আসা নাগরিকদের পুনর্বাসনে দুই বছরের একটি প্রকল্প শুরু করার পরিকল্পনা করছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে প্রায় ৫ লাখ ৮১ হাজার সিরীয় নাগরিক বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন।
এই ফেরত আসাদের বেশিরভাগই তুরস্ক ও লেবানন থেকে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধ চলাকালে লক্ষ লক্ষ সিরীয় নাগরিক নিরাপত্তার খোঁজে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে জার্মানিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সিরীয় নাগরিক অবস্থান করছেন, আর তুরস্কে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ সিরীয় শরণার্থী। লেবানন, জর্ডান, ইরাক ও মিসরও যুদ্ধকালীন সময়ে বড় গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল।
তবে যুদ্ধ-পরবর্তী অস্থির শান্তি অনেক সিরীয়ের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে—অনেকের ফিরে যাওয়ার মতো কিছু নেই, আবার অনেকে ফিরতেও পারছেন না। অন্যদিকে ইউরোপে আশ্রয়নীতিতে পরিবর্তন আসছে এবং অনেক দেশ এখন শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরাতে উদ্যোগী হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, লিবিয়ার মতো দেশে এসব প্রত্যাবর্তন অনেক সময় “স্বেচ্ছায়” হলেও তা চাপের মুখে হয়। আটক ও নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে অনেককেই প্রত্যাবর্তন চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হচ্ছে।
অন্যদিকে লিবিয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রত্যাবর্তন কার্যক্রমও চলছে। ত্রিপোলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, একই দিনে ৩০৯ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন এবং তারা আজ ঢাকায় পৌঁছানোর কথা।
দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স কাজী আসিফ আহমেদ জানিয়েছেন, লিবিয়া সরকারের সহযোগিতায় আরও ছয় শতাধিক বাংলাদেশিকে দুটি ফ্লাইটে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০১৭ সাল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে বাংলাদেশিরা শীর্ষ অভিবাসী গোষ্ঠীগুলোর একটি। ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশিরা মালি ও সেনেগালের পর তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী ছিল এই বিপজ্জনক পথের যাত্রীদের মধ্যে।
আইওএম-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে লিবিয়ায় প্রায় ২১ হাজার ১৩৪ জন বাংলাদেশি ছিলেন, যা দেশটির মোট অভিবাসীর প্রায় তিন শতাংশ। তাদের বেশিরভাগের বয়স ২০ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে, অধিকাংশই পুরুষ ও অবিবাহিত। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের কাজের অনুমতিপত্র রয়েছে এবং তারা মূলত নির্মাণকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও রেস্তোরাঁকর্মী হিসেবে কাজ করেন।
গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় দীর্ঘ অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটি আফ্রিকা থেকে ইউরোপগামী অভিবাসীদের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। ইউরোপে যেতে চাওয়া অনেকেই বিপজ্জনক সাগরপথে যাত্রা করেন, আর তাদের অনেককেই লিবিয়ার উপকূলরক্ষী বাহিনী আটকে দেয় ও আটক শিবিরে পাঠায়।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) বারবার আহ্বান জানিয়েছে, লিবিয়ায় আটক শরণার্থী ও অভিবাসীদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে। তাদের অনেকে অমানবিক পরিবেশে আটক রয়েছেন, যেখানে নির্যাতন, সহিংসতা, দাসত্ব, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও হত্যার ঘটনা নিয়মিতভাবে ঘটছে।
















