বিশ্বজুড়ে প্রকৃতির অবক্ষয় যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে বলে এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে দেশটির গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের ফলে সংঘাত, অভিবাসন বৃদ্ধি, সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা এবং মহামারির ঝুঁকিসহ একের পর এক সংকট তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাজ্য এমন সব বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল যেগুলো ধ্বংসের পথে রয়েছে। এর মধ্যে আমাজনের মতো রেইনফরেস্ট অন্যতম। এসব ব্যবস্থার অবনতি হলে খাদ্যের দাম বাড়বে এবং যুক্তরাজ্যের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণবিষয়ক দপ্তরের মাধ্যমে প্রকাশিত ১৪ পৃষ্ঠার এই নথি মূলত যৌথ গোয়েন্দা কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে প্রকৃতি ধ্বংসের সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি ছয়টি অঞ্চলকে যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আমাজন ও কঙ্গো অববাহিকার রেইনফরেস্ট, রাশিয়া ও কানাডার বোরিয়াল বনাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবালপ্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ বন এবং হিমালয় অঞ্চল। বর্তমান হারে প্রকৃতি ধ্বংস চলতে থাকলে এসব বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও তা কখন ঘটবে সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বাস্তুতন্ত্রের অবনতি যুক্তরাজ্যের জন্য অভিবাসন চাপ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে খাদ্য সরবরাহ নিয়ে প্রতিবেদনের ভাষা সবচেয়ে কঠোর। এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে বড় খাদ্য উৎপাদনকারী অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্যের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান খাদ্যাভ্যাস ও দামের কাঠামো অনুযায়ী যুক্তরাজ্য নিজস্বভাবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছে না। সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হলে ভোক্তাদের জন্য বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি মেনে নিতে হবে। তবে পুনর্জীবনশীল কৃষি বা পরীক্ষাগারে উৎপাদিত প্রোটিনের মতো প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কিছুটা সহায়তা করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়া ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেছেন এক জ্বালানি ও জলবায়ু বিশ্লেষক। তাঁর মতে, এর প্রভাব সরাসরি যুক্তরাজ্যের বাজারে খাদ্যের দাম বাড়িয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট তৈরি করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের খাদ্য ব্যবস্থা স্থিতিশীল এবং দেশটি এখনও বিশ্বের অন্যতম খাদ্য নিরাপদ রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে, যাতে খারাপ আবহাওয়া বা রোগবালাইয়ের মতো ঝুঁকি সামগ্রিক সরবরাহে বড় প্রভাব না ফেলে।
প্রতিবেদনটি গত অক্টোবরেই প্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও বিলম্ব হয়। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এটি অতিরিক্ত নেতিবাচক মনে হতে পারে—এই আশঙ্কায় প্রকাশে দেরি করা হয়েছিল। এদিকে সরকার প্রকৃতি সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে বলেও সমালোচনা করেছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
বিশ্বব্যাপী সংরক্ষণ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জীববৈচিত্র্যের অবনতি দ্রুত ঘটছে। আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন ও বহিরাগত প্রজাতির বিস্তারের কারণে এই সংকট আরও গভীর হচ্ছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, মানব ইতিহাসে এত দ্রুতগতিতে প্রকৃতির পরিবর্তন আগে কখনও দেখা যায়নি এবং প্রায় দশ লাখ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।















