২০২৫ সালে ছিনতাই–ডাকাতি–অপহরণে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি, বাড়ছে নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা
অপরাধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনজীবনে প্রভাব ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন
ঘরে ডাকাতি, পথে ছিনতাই, চুরি ও অপহরণ—২০২৫ সালে এসব অপরাধের ঘটনায় মামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মামলার সংখ্যা বাড়া মানেই বাস্তবে অপরাধের ঘটনাও বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও চলাচলে গভীর নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করছে।
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের শিকার বেসরকারি চাকুরে কাজী মোহাম্মদ আ. হাদীদের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। তিনি রাইড শেয়ারের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় করতেন। গত বছরের ২৪ জানুয়ারি রাতে বনানীতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে তিনি আহত হন এবং মুঠোফোন ও মানিব্যাগ হারান। পরে জনতার সহায়তায় দুজন ছিনতাইকারী ধরা পড়লেও তার ক্ষতির পরিমাণ কমেনি।
হাদীদ জানান, এক মাসের বেশি সময় কাজ করতে না পারায় তিনি চাকরি হারান। আদালত থেকে জব্দ মুঠোফোন ছাড়াতে খরচ হয়েছে সাড়ে চার হাজার টাকা। মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স উদ্ধার করতেও পড়তে হচ্ছে জটিলতায়। একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার আর্থিক ক্ষতি, শারীরিক আঘাত ও কর্মজীবন—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯৩৫টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি। ডাকাতির মামলা হয়েছে ৭০২টি, বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। চুরির মামলা বেড়েছে ১২ শতাংশ (৯ হাজার ৬৭২টি)। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে অপহরণের মামলা—৭১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০১টিতে।
এই চার ধরনের অপরাধে মোট মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৪১০টি, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। তবে বাস্তবে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে না যাওয়ায় প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, মামলা বাড়ার একটি বড় কারণ হলো এখন মামলা করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে। অনেক পুরোনো ঘটনার মামলাও সাম্প্রতিক সময়ে নথিভুক্ত হয়েছে। তার দাবি, সামগ্রিকভাবে সব ধরনের অপরাধ বাড়েনি, বরং খুনসহ কিছু অপরাধে মামলা কমেছে।
তবে পুলিশেরই তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সব ধরনের অপরাধে মোট মামলা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টিতে, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ হাজার ৭৩২টি বেশি।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চুরির মামলা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনায় উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি ঘটেছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের চলাচল ও জীবনযাত্রায়।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন জানান, ভোরে বাস টার্মিনালে যাওয়া কিংবা রাতের বাসে ফিরে বাসায় আসা—দুটোতেই ছিনতাইয়ের আশঙ্কা কাজ করে। তার মতো অনেক নাগরিকই এখন প্রকাশ্যে নিরাপত্তাহীনতার কথা বলছেন।
প্রথম আলোর উদ্যোগে করা কিমেকার্স কনসাল্টিং লিমিটেডের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করেন সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ। মাত্র ৩৯ শতাংশ মনে করেন সরকার সফল।
খুনের মামলাও বেড়েছে। পুলিশের হিসাবে, ২০২৫ সালে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৭৮৬টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫৪টি বেশি। যদিও পুলিশ বলছে, এর একটি অংশ আগের ঘটনার বিলম্বিত মামলা। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব সন্ত্রাস নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল তৎপরতার সুযোগে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে উঠছে। তার ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন নাজুক, বাহিনীগুলো পুরোপুরি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না বলেই অপরাধীরা বেশি সুযোগ পাচ্ছে।
















