খাবারের ধরন দেখেই বুঝতেন সকাল না ঈদ, সাত মাস কাটে অন্ধকার সেলে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা
গুম অবস্থায় থাকাকালে দিন ও রাতের কোনো ধারণাই ছিল না হুম্মাম কাদের চৌধুরীর। কখন সকাল, কবে ঈদ—তা বুঝতেন খাবারের ধরন দেখে। সকালে রুটি দেওয়া হলে বুঝতেন নতুন দিন শুরু হয়েছে, আর একদিন বিরিয়ানি পেয়ে বুঝেছিলেন ঈদের দিন। সেলের বাইরে মাঝেমধ্যে হিন্দি ভাষায় কথাবার্তাও শুনতে পেতেন বলে জানান তিনি।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব তথ্য তুলে ধরেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে গুমের অভিযোগে এই মামলাটি করা হয়েছে। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক ১২ জন সেনা কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন। প্যানেলের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
৪২ বছর বয়সী হুম্মাম চৌধুরী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম–৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে গুমের যে সংস্কৃতি ছিল, তিনি তার একজন ভুক্তভোগী।
তার জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট সকালে সাত থেকে আটজন সাধারণ পোশাকধারী ব্যক্তি তাকে রাস্তা থেকে জোর করে বংশাল থানায় নিয়ে যান। সেখান থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। রাত ১১টার পর ভাঙা একটি মাইক্রোবাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে পৌঁছানোর পর তার চোখ বেঁধে দেওয়া হয়। গাড়ির শব্দ ও গতিপথ থেকে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নেওয়া হচ্ছে।
সেখানে পৌঁছে তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে অন্য একটি দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে জমটুপি পরিয়ে একটি সেলে বন্দি রাখা হয়। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে অস্বীকার করায় মারধর শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে তাকে আরেকটি সেলে নেওয়া হয়, যেখানে কাপড় খুলে ছবি তোলা হয়। প্রতিবাদ করলে ঝুলিয়ে রাখার হুমকি দেওয়া হয়। শেষে একটি পুরোনো টি–শার্ট ও প্যান্ট দেওয়া হয় এবং ঘড়িসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। এই সেলেই তিনি টানা সাত মাস কাটান। সেলের ভেতরে ছিল একটি চৌকি, একটি টেবিল ও একটি প্লাস্টিকের চেয়ার। টেবিলের নিচে লাল কালি দিয়ে লেখা ছিল ‘সিটিআইবি’।
তিনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা বাথরুমে নেওয়ার সময়ও চোখ বাঁধা থাকত, পরানো হতো হ্যান্ডকাফ ও জমটুপি। নির্যাতনের ফলে তার শরীরে ঘা ও ফোঁড়া হয়। একপর্যায়ে সেলের ভেতরেই ফোঁড়ার অস্ত্রোপচার করা হয়। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে তিনি মেঝেতে রক্ত ও ব্যবহৃত গজ পড়ে থাকতে দেখেন।
হুম্মাম চৌধুরী বলেন, তাকে যে ওষুধ দেওয়া হতো, তা সাধারণত মোড়ক ছাড়া দেওয়া হতো। একদিন ভুল করে মোড়কসহ ওষুধ এলে সেখানে ‘ভিআইপি–১’ লেখা দেখতে পান। তখন তিনি বুঝতে পারেন, এটি তার কোড নাম। মাঝেমধ্যে ইনজেকশন দেওয়া হতো, যাতে সারা শরীর জ্বলে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতো। বারবার ইনজেকশনের কারণে তার হাত কালো হয়ে যায়। কোনো কোনো সময় শিরার মাধ্যমে কেমিক্যাল পুশ করা হতো। সেই ব্যাগে লেখা ছিল, ‘ডিফেন্স মেডিসিন, নট ফর সেল’।
খাবারের মাধ্যমেই তিনি দিনের হিসাব রাখতেন বলে জানান। প্রথম দুই মাস দেয়ালে পেরেক দিয়ে দাগ কেটে দিন গুনলেও পরে তা বন্ধ করে দেন। জানালাগুলো ছিল কালো রঙে রাঙানো, বাইরে আলো আছে কি না বোঝার উপায় ছিল না।
সেলের দেয়ালে আগের বন্দিদের লেখা বার্তাও দেখেছিলেন তিনি। এক জায়গায় লেখা ছিল, ‘আপনাকে কতদিন এখানে রাখা হবে, তা কেউ আপনাকে বলবে না।’ অন্য পাশে আঁকা ছিল বাংলাদেশের পতাকা। নিজের বন্দিত্বের চিহ্ন হিসেবে তিনি দেয়ালের এক কোণে নিজের ইনিশিয়াল ‘এইচকিউসি’ ও অপহরণের তারিখ লিখে রাখেন।
তিনি বলেন, আজানের শব্দ ও শীতকালে ওয়াজ মাহফিলের আওয়াজ শুনতে পেতেন। একদিন একাধিক ফাইটার জেটের শব্দ শুনে তার মনে হয়েছিল, হয়তো সেদিন ১৬ ডিসেম্বর।
মুক্তির দিন তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় একটি ফুটপাতে বসিয়ে হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হয়। চোখ খুলতে নিষেধ করে তিন মিনিট অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ধানমন্ডি ৭/এ এলাকায় আছেন, যা তার বাসা থেকে কয়েক রাস্তা দূরে।
বাসায় পৌঁছালে দারোয়ান প্রথমে তাকে চিনতে পারেননি। ওজন কমে যাওয়া, লম্বা চুল ও দাঁড়ির কারণে তার চেহারা বদলে গিয়েছিল। তবে বাড়ির পোষা কুকুর তাকে চিনে ফেলে।
পরে তিনি জানতে পারেন, তাকে আটকের সময় সিটিআইবির পরিচালক ছিলেন তৌহিদুল ইসলাম, ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন জেনারেল আকবর এবং মুক্তির সময় প্রধান ছিলেন জেনারেল আবেদিন। তাকে মুক্তি দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ২ মার্চ।
হুম্মাম চৌধুরী আরও জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিনি তার বন্দিত্বের স্থান পরিদর্শনের সুযোগ পান। জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারের কোড নাম ছিল ‘আয়নাঘর’। সেখানে গিয়ে তিনি নিজের সেল শনাক্ত করতে পেরেছিলেন, কারণ দেয়ালে তখনো তার লেখা ইনিশিয়াল ও অপহরণের তারিখ ছিল।
জবানবন্দির একপর্যায়ে তিনি বলেন, বন্দিত্বকালে জিজ্ঞাসাবাদের সময় কোনো বিদেশিকে দেখেননি। তবে সেলের বাইরে কয়েকবার হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন।
জবানবন্দি শেষে সাক্ষীকে জেরা করার জন্য আগামী ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গত ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়।
















