যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সাম্প্রতিক রেয়ার আর্থ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তে ‘অবাক’ হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, চীন এখন ‘অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন’ আচরণ করছে।
তবে বেইজিংয়ের দাবি, উত্তেজনা বাড়ানোর পেছনে মূল ভূমিকা নিয়েছে ওয়াশিংটনই। যুক্তরাষ্ট্র চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নতুন করে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় চীন বাধ্য হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানগুলোর ওপর আরও কঠোর রপ্তানি বিধিনিষেধ জারি করতে।
গত সপ্তাহান্তে হঠাৎ করে উত্তেজনা বাড়ে, যখন ট্রাম্প ঘোষণা দেন— চীনের নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র তিন অঙ্কের শুল্ক হার পুনর্বহাল করবে। এর জবাবে চীন জানায়, তারা ‘সমপর্যায়ের প্রতিক্রিয়া’ দেখাবে।
বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির এই দ্বন্দ্ব নতুন করে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং আশঙ্কা বাড়িয়েছে যে, আগের মতো আবারও বাণিজ্য যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এতে করে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য আলোচনাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় মাস শেষে নির্ধারিত শি জিনপিং ও ট্রাম্পের বৈঠকটি এখন প্রশ্নের মুখে।
যদিও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন বৈঠক বাতিল হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, তারা এখনও বৈঠকটি হওয়ার আশা করছেন।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানায়, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন হুমকি দেয়, তাহলে তা আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করবে।
বেইজিংয়ের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উত্তেজনার মূল কারণ সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে কয়েক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় যুক্ত করা। রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সরকার উপদেষ্টা জিন কানরং বলেন, চীন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের “ক্ষুদ্র ও কৌশলগত চাল” এর জবাব দিয়েছে।
তিনি বলেন, “আমেরিকা আগে চীনকে আঘাত করে, তারপর আবার নিজেকে নির্দোষ সাজিয়ে ভুক্তভোগী সেজে ওঠে।”
ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ডিন উ সিনবো বলেন, সেপ্টেম্বরের ফোনালাপে শি জিনপিং ট্রাম্পকে একতরফা বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা না বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু ১০ দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে দেয়।
চীনের দৃষ্টিতে এটি ‘চরম শত্রুভাবাপন্ন আচরণ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র চীনা জাহাজের ওপর অতিরিক্ত ফি আরোপের পরিকল্পনাও করছে, যা দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করছে।
বাণিজ্য বিশ্লেষক পল ট্রিওলো বলেন, “আমরা আবারও এক বিপজ্জনক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। আগেরবার যেমন উত্তেজনা চরমে গিয়েছিল, এবার তার ঝুঁকি আরও বেশি।”
তিনি বলেন, চীনের রেয়ার আর্থ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের যুক্তিসঙ্গত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ জবাব, নতুন করে চাপ সৃষ্টি নয়।
চীন বিশ্বের রেয়ার আর্থ খনিজ সরবরাহের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। নতুন নীতিতে শুধু রপ্তানির ওপরই নয়, উৎপাদন প্রযুক্তি ও বিদেশে ব্যবহারের দিকেও কড়াকড়ি আনা হয়েছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়েছে, এটি কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং সঠিক শর্ত পূরণ করলে রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতোই এবার চীন একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছে। বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপ দেখাচ্ছে, তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের মতোই কঠোর বাণিজ্য কৌশল নিতে প্রস্তুত।
ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের উ সিনবো বলেন, “ট্রাম্প থেকে বাইডেন, আবার ট্রাম্প— এই তিন পর্বে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে নানা শুল্ক ও প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। চীন প্রতিটি ঘটনার হিসাব রেখেছে, এবার পাল্টা সময় এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, বৈঠক হবে কি না, এখন তা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। “যুক্তরাষ্ট্রকেই এখন ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। কেবল বৈঠকের জন্য চীন তার স্বার্থ বিসর্জন দেবে না।”
ট্রাম্প অবশ্য পরবর্তীতে কিছুটা নরম সুরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র “চীনকে সাহায্য করতে চায়, ক্ষতি নয়।”
রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াং ইওয়ে বলেন, চীন ট্রাম্পের কৌশল অনেক আগেই বুঝে নিয়েছে এবং এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। “বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রই বেশি উদ্বিগ্ন, চীন নয়।”
তিনি আরও বলেন, “চীনের হাতে রেয়ার আর্থ সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ থাকায়, স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের চীনের ওপর নির্ভরতা থাকবেই। আমেরিকানদের এখন বাস্তবতা মেনে নেওয়া উচিত— চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করাই ভালো।”

















