কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন এমন কিছু অপটিক্যাল ইলিউশনে বিভ্রান্ত হচ্ছে, যেগুলো মানুষের চোখ ও মস্তিষ্ককেও বিভ্রান্ত করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ঘটনা মানব মস্তিষ্ক কীভাবে বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছে।
অপটিক্যাল ইলিউশন দেখায় যে আমরা সব সময় বাস্তবতাকে সরাসরি বা নির্ভুলভাবে দেখি না। উদাহরণ হিসেবে চাঁদের কথাই ধরা যায়—দিগন্তের কাছে থাকলে চাঁদকে বড় মনে হয়, অথচ বাস্তবে তার আকার বা পৃথিবী থেকে দূরত্বে কোনো পরিবর্তন হয় না। এসব বিভ্রমকে অনেক সময় দৃষ্টিব্যবস্থার ভুল হিসেবে দেখা হলেও, গবেষকরা বলছেন এগুলো আসলে মস্তিষ্কের বুদ্ধিদীপ্ত ‘শর্টকাট’ ব্যবহারের ফল।
মানব মস্তিষ্ক চারপাশের সব তথ্য একসঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। তাই প্রয়োজনীয় অংশ বেছে নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে পারদর্শী এআই সিস্টেমও কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের বিভ্রমে পড়ে যাচ্ছে।
জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর বেসিক বায়োলজির গবেষক এইজি ওয়াতানাবে জানান, গভীর নিউরাল নেটওয়ার্ক বা ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অপটিক্যাল ইলিউশন নিয়ে গবেষণা করলে মানব মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ধরন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। মানুষের মস্তিষ্কে সরাসরি পরীক্ষার নৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও কৃত্রিম মডেলে সে বাধা নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু এআই মডেল মানুষের মতোই গতির বিভ্রমে বিভ্রান্ত হয়। যেমন ‘রোটেটিং স্নেকস’ নামে পরিচিত একটি স্থির ছবি, যা মানুষের চোখে ঘূর্ণায়মান বলে মনে হয়। গবেষকরা দেখেছেন, প্রেডনেট নামের একটি এআই মডেলও একই ছবিকে চলমান হিসেবে শনাক্ত করেছে, যদিও তাকে আগে কখনো অপটিক্যাল ইলিউশন দেখানো হয়নি।
এই প্রেডনেট মডেলটি মানব মস্তিষ্কের ‘প্রেডিকটিভ কোডিং’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মস্তিষ্ক আগে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনুমান করে কী দেখবে, তারপর চোখ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সেই অনুমান মিলিয়ে নেয়। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
তবে মানুষের সঙ্গে এআইয়ের পার্থক্যও স্পষ্ট। মানুষ কোনো ইলিউশনের নির্দিষ্ট অংশে তাকালে সেটিকে স্থির মনে করতে পারে, অথচ এআই পুরো ছবিকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে এবং সব অংশকে সমানভাবে গতিশীল বলে ধরে নেয়। গবেষকদের মতে, এআইয়ের মধ্যে মনোযোগ বা ফোকাসের মানবসদৃশ ব্যবস্থা না থাকাই এর কারণ।
এখনো এমন কোনো এআই নেই, যা মানুষের দেখা সব ধরনের অপটিক্যাল ইলিউশন অনুভব করতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এআই ও মানব মস্তিষ্কের মিল থাকলেও দুটির গঠন ও কাজের ধরন মৌলিকভাবে আলাদা।
এদিকে কিছু গবেষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কোয়ান্টাম মেকানিক্স যুক্ত করে মানুষের দৃষ্টিভ্রম বোঝার চেষ্টা করছেন। কোয়ান্টাম তত্ত্বের ধারণা ব্যবহার করে এমন মডেল তৈরি করা হয়েছে, যা নেকার কিউব বা রুবিন ভেসের মতো দ্ব্যর্থক ছবির ক্ষেত্রে মানুষের মতোই দুই ব্যাখ্যার মধ্যে বারবার পরিবর্তন ঘটায়।
অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভান ম্যাকসিমভ বলেন, এই গবেষণা সীমিত হলেও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে। গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে মহাকর্ষের অভাবে মানুষের দৃষ্টিভ্রমের ধরন বদলে যায়।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এআইয়ের এই সীমাবদ্ধতা ও সক্ষমতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে শুধু প্রযুক্তির উন্নয়নই নয়, বরং মানব মস্তিষ্ক কীভাবে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে, সেই জটিল প্রক্রিয়াও আরও গভীরভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
















