দীর্ঘদিন ধরেই কল্পবিজ্ঞানের গল্পে দেখা গেছে মানুষের ঘরের কাজ সামলাবে রোবট সহকারী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির ফলে সেই ধারণা এখন বাস্তবের কাছাকাছি চলে এসেছে। চলতি বছরই প্রথমবারের মতো একাধিক বহুমুখী গৃহস্থালি রোবট সাধারণ মানুষের ঘরে ব্যবহারের জন্য বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সিলিকন ভ্যালিতে তৈরি এসব রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে কাপড় ভাঁজ করা, বাসনপত্র ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা ও দৈনন্দিন নানা একঘেয়ে কাজের জন্য। নির্মাতারা বলছেন, ভবিষ্যতে রোবট হবে গাড়ি ও বাড়ির মতোই মানুষের জীবনের অপরিহার্য অংশ। তবে বাস্তবে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
ট্যাঙ্গিবল এআইয়ের তৈরি রোবট এগি ধীরে ধীরে কোট ঝোলানো, বিছানা গুছানো বা রান্নাঘরের কাউন্টার পরিষ্কার করতে পারে। তবে তার গতি বেশ ধীর এবং চলাফেরাও খানিকটা অস্বচ্ছন্দ। একইভাবে ১এক্স কোম্পানির তৈরি নিও নামের রোবট গাছের পানি দেওয়া, পানীয় এনে দেওয়া বা বাসনপত্র গুছিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও অনেক সময় মানুষের সহায়তা নিতে হয়।
এই রোবটগুলোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, বেশির ভাগ কাজেই এখনো মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি হেডসেট ও সেন্সরের মাধ্যমে দূর থেকে অপারেটররা রোবটকে চালনা করেন, যা প্রচারণামূলক ভিডিওতে খুব একটা দেখানো হয় না।
১এক্স-এর প্রধান নির্বাহী জানান, তার নিজের ঘরেও রোবট নিও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে সহায়তা করে, তবে সেটি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় নয়। পর্যাপ্ত তথ্য ও অভিজ্ঞতা জমলে ভবিষ্যতে রোবট আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী।
তবে এসব রোবটের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। নিও রোবটের মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ডলার বা মাসে প্রায় ৫০০ ডলার ভাড়ায় ব্যবহারের সুযোগ। ফলে শুরুতে ধনী ও প্রযুক্তিপ্রেমী ব্যবহারকারীরাই এর প্রধান গ্রাহক হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সান ফ্রান্সিসকোতে উইভ রোবোটিকসের তৈরি আইজ্যাক নামের একটি রোবট ইতোমধ্যে লন্ড্রোম্যাটে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাপড় ভাঁজ করতে পারে। যদিও এটি নির্দিষ্ট কাজেই সীমাবদ্ধ, তবে নির্মাতারা বলছেন, বাস্তব পরিবেশে ব্যবহার করেই রোবটকে দ্রুত উন্নত করা সম্ভব।
সানডে এআইয়ের তৈরি মেমো নামের রোবট কফি বানানো, মোজা গুছানো কিংবা ভঙ্গুর গ্লাস সরানোর মতো কাজও করতে পারে। তবে প্রথম পরীক্ষাতেই একটি গ্লাস ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে, যা দেখিয়ে দেয় প্রযুক্তিটি এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
এদিকে ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান নিজে রোবট না বানিয়ে রোবটের ‘মস্তিষ্ক’ উন্নয়নে কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য, যেকোনো সাধারণ রোবটকেও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কার্যকর করে তোলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গৃহস্থালি রোবট সত্যিকার অর্থে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে আরও অনেক সময় লাগবে। আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স ফেডারেশনের ধারণা, এসব রোবট পুরোপুরি কার্যকর ও জনপ্রিয় হতে অন্তত ২০ বছর সময় লাগতে পারে।
তবুও প্রযুক্তিবিদদের বিশ্বাস, একদিন এসব রোবট শুধু ধনীদের বিলাসিতা নয়, বরং সাধারণ মানুষের ঘরেও প্রয়োজনীয় সহকারী হয়ে উঠবে। প্রশ্ন শুধু একটাই—সেই দিনটি ঠিক কত দূরে।
















