দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিখোঁজ আরোহী বা পর্যটকদের খুঁজে বের করতে উদ্ধারকর্মীদের অনেক সময় সপ্তাহ কিংবা মাসও লেগে যায়। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে সেই কাজ কিছু ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্ভব হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে প্রাণ বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইতালির পিয়েমন্তে অঞ্চলে এমনই এক অনুসন্ধান অভিযানে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অভিজ্ঞ পর্বতারোহী ও অর্থোপেডিক সার্জন নিকোলা ইভালদো ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিখোঁজ হন। ৬৬ বছর বয়সী ইভালদো একা পাহাড়ে ওঠার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন তা পরিবারের কাউকে জানাননি। সোমবার কাজে না পৌঁছানোয় তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
উদ্ধারকর্মীরা কেবল একটি গাড়ির সন্ধান পান, যা ভালে ভারাইতা এলাকার কাস্তেল্লো দি পোন্তেকিয়ানালে গ্রামে পার্ক করা ছিল। ধারণা করা হয়, সেখান থেকে তিনি কোটিয়ান আল্পসের দুটি প্রধান শৃঙ্গের একটি, মনভিসো অথবা ভিসোলত্তোর দিকে গিয়েছিলেন। তাঁর মোবাইল ফোনের শেষ সংকেতও ওই এলাকার কাছাকাছি পাওয়া যায়।
তবে এই সূত্র উদ্ধারকারীদের সামনে বিশাল এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। পাহাড় দুটি বিশাল ও দুর্গম, যেখানে শীর্ষে ওঠার জন্য রয়েছে অসংখ্য পথ। শত শত কিলোমিটার ট্রেইলজুড়ে বিস্তৃত ওই এলাকায় কোথা থেকে অনুসন্ধান শুরু করতে হবে, তা নির্ধারণ করাই ছিল কঠিন।
ঘটনার দিন আবহাওয়া ভালো থাকায় জনপ্রিয় পথগুলোতে অনেক মানুষ ছিল, কিন্তু কেউই ইভালদোকে দেখার কথা জানাননি। এতে ধারণা করা হয়, অভিজ্ঞ এই পর্বতারোহী হয়তো অপেক্ষাকৃত দুর্গম কোনো পথ বেছে নিয়েছিলেন।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পঞ্চাশের বেশি উদ্ধারকর্মী পায়ে হেঁটে অনুসন্ধান চালান এবং হেলিকপ্টার থেকেও এলাকা তল্লাশি করা হয়। তবে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তুষারপাত শুরু হলে তাঁকে জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে যায় এবং অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরবর্তী বছরের জুলাই মাসে, বরফ অনেকটাই গলে যাওয়ার পর ইভালদোর দেহ উদ্ধারের নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবার পিয়েমন্তে অঞ্চলের উদ্ধারকারী দল ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি। ড্রোনের মাধ্যমে পাহাড়ের গিরিখাদ ও খাড়া দেয়ালের হাজার হাজার ছবি তোলা হয় এবং সেগুলো বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয় এআই সফটওয়্যার।
মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় দুটি ড্রোন ওই ছবি সংগ্রহ করে এবং একই দিন এআই বিশ্লেষণের মাধ্যমে কয়েকটি সন্দেহজনক স্থান চিহ্নিত করা হয়। খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেখানে সরাসরি যাচাই করতে কিছুটা সময় লাগলেও, তিন দিনের মধ্যেই এআই চিহ্নিত একটি স্থানে ইভালদোর মরদেহ পাওয়া যায়। মনভিসোর উত্তর দেয়ালের একটি গিরিখাদে প্রায় ৩১৫০ মিটার উচ্চতায় তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকর্মীদের মতে, এআই একটি লাল রঙের বস্তু শনাক্ত করেছিল, যা পরে ইভালদোর হেলমেট বলে প্রমাণিত হয়। বরফের ছায়ার মধ্যেও লাল রঙ শনাক্ত করতে পারাই ছিল এই প্রযুক্তির বড় সাফল্য।
যদিও ইভালদোর ক্ষেত্রে এটি অনেক দেরিতে কাজে এসেছে, তবে এই ঘটনা দেখিয়েছে, ভবিষ্যতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানে এআই কতটা কার্যকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথাগত অনুসন্ধান পদ্ধতির পাশাপাশি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে জীবিত অবস্থায় নিখোঁজদের খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
এর আগেও বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও যুক্তরাজ্যে এআইভিত্তিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্তের উদাহরণ রয়েছে।
তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। ঘন বনাঞ্চল, জটিল ভূপ্রকৃতি কিংবা কম দৃশ্যমানতার এলাকায় ড্রোন ও এআই কার্যকর নয়। এছাড়া ভুল সংকেত বা বিভ্রান্তিকর ফলাফলও দিতে পারে এসব সফটওয়্যার। তাই মানব অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত এআই, বাস্তব সময়ের বিশ্লেষণ এবং উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়ার সময় কমবে এবং প্রাণ রক্ষার সুযোগ বাড়বে।















