পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও লেভান্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাসের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা নতুন করে তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলটি ধীরে ধীরে তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নতুন কৌশলগত মঞ্চে পরিণত হতে পারে।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে প্রায় একই সময়ে দুটি বৈঠক এই প্রতিদ্বন্দ্বী কৌশলগুলোকে স্পষ্ট করে তোলে। একদিকে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে তুরস্কের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা প্রধানরা সিরীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনর্গঠনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। অন্যদিকে একই দিনে জেরুজালেমে ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাসের নেতারা ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন।
এই বৈঠকের আগে ও পরে সিরিয়ায় ইসরায়েলের বিমান হামলা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ২০২৫ সালজুড়ে সিরিয়ায় ইসরায়েলের শতাধিক হামলা আঙ্কারা ও দামেস্ককে বার্তা দেয় যে, সিরিয়ার পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ইসরায়েল বাধা দিতে প্রস্তুত।
যদিও ত্রিপক্ষীয় এই উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংযোগের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বাস্তবে এতে নিরাপত্তা ও সামরিক সমন্বয়ের দিকটি ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। তুরস্কের ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ সামুদ্রিক নীতির অন্যতম রূপকার অবসরপ্রাপ্ত নৌ-অ্যাডমিরাল সেম গুরদেনিজের মতে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য তুরস্ককে কোণঠাসা করা। তিনি মনে করেন, এটি সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, বরং তুরস্কের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করে তার আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল সিরিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আঙ্কারা সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও কেন্দ্রীয় শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিলেও, ইসরায়েল একটি বিভক্ত ও দুর্বল নিরাপত্তা কাঠামোকেই নিজেদের স্বার্থের জন্য বেশি সুবিধাজনক মনে করে। অন্যদিকে গ্রিস ও সাইপ্রাস পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সমুদ্রসীমা ও জ্বালানি করিডর সংক্রান্ত দাবিতে তুরস্ককে পাশ কাটিয়ে এগোতে এই অংশীদারিত্বকে ব্যবহার করতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে জেরুজালেমে বৈঠক আয়োজনের বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। গাজায় চলমান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে ইসরায়েলি নেতৃত্বের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে। ফলে গ্রিস ও সাইপ্রাসের মতো দেশগুলোকে ইসরায়েলেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পরোক্ষভাবে তুরস্ককে ইঙ্গিত করে ‘সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের স্বপ্ন’ দেখানোদের সতর্ক করেন। এ মন্তব্য আঙ্কারার জন্য কৌশলগত বার্তা বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রিস-তুরস্ক বিরোধ দীর্ঘদিনের। গ্রিসের দাবি, তাদের দ্বীপগুলোর ভিত্তিতে বিস্তৃত সমুদ্র অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের অধিকার রয়েছে। তুরস্ক এই দাবি মানে না এবং মূল ভূখণ্ডের ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণের পক্ষে। সাইপ্রাস নিয়েও একই ধরনের বিরোধ বিদ্যমান, যা ইসরায়েলকে আঞ্চলিক বিভাজনকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এই সহযোগিতার অংশ হিসেবে গ্রিস ও সাইপ্রাস ইসরায়েল থেকে আধুনিক অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে। গ্রিস ইতিমধ্যে শত কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এগিয়েছে, সাইপ্রাসও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংগ্রহ করছে।
তবে তুরস্কের প্রতিক্রিয়া এখনো সংযত। দেশটির নেতৃত্ব বলছে, এই ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ তুরস্কের জন্য সরাসরি সামরিক হুমকি নয়। একই সঙ্গে আঙ্কারা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বড় পরিসরে নৌবাহিনী আধুনিকায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়া থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ইসরায়েলের এই পদক্ষেপগুলো একটি সমন্বিত চাপ সৃষ্টির কৌশল নির্দেশ করে, যার লক্ষ্য তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা। প্রশ্ন উঠছে, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে এই উত্তেজনা প্রশমিত হবে, নাকি পূর্ব ভূমধ্যসাগর নতুন সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
















