আয়কর নথি ও হলফনামায় আয়ের বিশাল গরমিল; নজরদারি নেই এনবিআর ও নির্বাচন কমিশনের
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজতেই প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থীর সম্পদের বিবরণী বা হলফনামা এখন জনসমক্ষে। রাজপথে কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি আর আভিজাত্যে ঘেরা জীবনযাপন করলেও হলফনামায় নিজেকে ‘স্বল্পবিত্ত’ প্রমাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী। এমনকি অনেক প্রার্থীর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, যেখানে একজন প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারের ন্যূনতম ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে অর্ধকোটি টাকারও বেশি। আয়কর নথির সঙ্গে হলফনামার তথ্যের এই আকাশ-পাতাল পার্থক্যের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বা নির্বাচন কমিশনের কার্যকর কোনো তদারকি নেই বলে অভিযোগ তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও, তদারকির অভাবে এই প্রক্রিয়াটি এখন স্রেফ ‘আনুষ্ঠানিকতায়’ পরিণত হয়েছে।
শীর্ষ নেতাদের আয়ের খতিয়ান
হলফনামা বিশ্লেষণ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের যে আয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, তা সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে:
- তারেক রহমান (বিএনপি): ২০২৫-২৬ করবর্ষে তাঁর বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
- ডা. শফিকুর রহমান (জামায়াত): পেশায় চিকিৎসক হয়েও তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
- নাহিদ ইসলাম (জাতীয় নাগরিক পার্টি): অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টার গত এক বছরে আয় ছিল ১৩ লাখ ৫১ টাকা।
- আবদুল আউয়াল মিন্টু (বিএনপি): বর্তমানে প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী এই ব্যবসায়ীর কেবল অকৃষি জমি থেকেই বার্ষিক আয় ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
কেন আয় গোপন করছেন প্রার্থীরা?
বিশ্লেষকরা প্রার্থীদের এই ‘দরিদ্র’ সাজার পেছনে ৭টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন: ১. কর ফাঁকি: প্রকৃত আয় দেখালে সরকারকে বড় অংকের কর দিতে হবে। ২. ব্যয়ের বৈধতা: নির্বাচনী প্রচারের বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে আইনি জটিলতা এড়ানো। ৩. ভাবমূর্তি রক্ষা: ভোটারদের কাছে নিজেকে ‘সাধারণ মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করা। ৪. অবৈধ সম্পদ লুকানো: অঘোষিত বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ আড়াল করা। ৫. আইনের দুর্বলতা: হলফনামা যাচাই-বাছাইয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জামায়াত নেতা মো. সাইফুল আলমের মাসিক আয় দেখানো হয়েছে সাড়ে ৮ হাজার টাকারও কম। অথচ এই আয়ে বর্তমান বাজারে একজন মানুষের জীবনধারণ করাই অসম্ভব, সেখানে নির্বাচনী লড়াই করার বিষয়টি হাস্যকর বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই কোটিপতি হলেও অনেকের বার্ষিক আয় আয়কর নথির তুলনায় অনেক কম
এনবিআরের সাবেক সদস্য ড. সৈয়দ আমিনুল করিম বলেন, “আয়কর রিটার্ন নিজেই একটি হলফনামা। সেখানে এক তথ্য আর নির্বাচনের হলফনামায় অন্য তথ্য দেওয়া মানেই হলো কোনো এক জায়গায় জালিয়াতি করা হয়েছে।” সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এনবিআর চাইলে এই অসংগতির জন্য প্রার্থীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) অনুযায়ী, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে। তবে মাঠ পর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কারিগরি সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটের কারণে এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি সবসময় নির্ভুল হয় না।
















