এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার জটিল সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। এই লক্ষ্যেই গত সোমবার বেইজিংয়ে দ্বিতীয় দফা শীর্ষ বৈঠকে বসেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি আসে এমন এক সময়ে, যখন আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে এবং কূটনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালের এপেক সম্মেলনের ফাঁকে দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংজুতে শি জিনপিংকে স্বাগত জানিয়েছিলেন লি জে মিয়ং। এবার চার দিনের সফরে বেইজিং যান দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট, যা ২০১৯ সালের পর কোনো দক্ষিণ কোরীয় রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম চীন সফর।
দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে এক জটিল অবস্থানে রয়েছে। একদিকে চীন তার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবনতি হয়েছে, যারা সিউলের প্রধান নিরাপত্তা মিত্র। একই সঙ্গে তাইওয়ান, বাণিজ্যিক বিরোধ এবং সামুদ্রিক দাবিদাওয়া নিয়ে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লি জে মিয়ংয়ের সফরের সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ। জানা গেছে, তিনি চলতি মাসের শেষ দিকে জাপান সফরের পরিকল্পনা করলেও তার আগে চীন সফরকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর পেছনে বড় কারণ অর্থনীতি। চীন দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং প্রধান আমদানি উৎস।
তবে শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্কই নয়, উত্তর কোরিয়া ইস্যুতেও বেইজিংয়ের ভূমিকা সিউলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিম জং উনের নেতৃত্বাধীন উত্তর কোরিয়ার ওপর চীনের প্রভাব রয়েছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে সেটি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বড় বিবেচ্য বিষয়। লি জে মিয়ং চীন সফরে রওনা হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তর কোরিয়ার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ এই নিরাপত্তা উদ্বেগকে আরও সামনে নিয়ে আসে।
বৈঠকের শুরুতে দুই নেতা উষ্ণ বক্তব্য দেন। শি জিনপিং বলেন, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া একে অপরের সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। লি জে মিয়ংও একই সুরে কথা বলেন।
হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের অধ্যাপক মেসন রিচি মনে করেন, এই বৈঠক ছিল চীনের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সূক্ষ্ম সম্পর্ক সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে লি জে মিয়ংয়ের প্রথম বড় পরীক্ষা। তার মতে, সৌহার্দ্যপূর্ণ কথাবার্তার আড়ালে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয় আলোচনায় আসেনি, যেমন ইয়েলো সাগরে চীনের কার্যক্রম কিংবা তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের ওপর বেইজিংয়ের চাপ।
আসান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের গবেষক লি দং গিউ বলেন, উভয় দেশই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের বিষয়ে একমত এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাকেই এগিয়ে নেওয়ার পথ হিসেবে দেখছে। তবে কূটনীতি ও নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।
৯০ মিনিটের বৈঠকে লি জে মিয়ং উত্তর কোরিয়াকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরাতে চীনের সহযোগিতার ওপর জোর দেন। যদিও নিরস্ত্রীকরণ প্রসঙ্গ সরাসরি ওঠেনি, শি জিনপিং আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নে যৌথ দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেন। দুই নেতা নিয়মিত বৈঠক এবং প্রতিরক্ষা পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর ব্যাপারেও একমত হন।
তাইওয়ান প্রসঙ্গে বৈঠকে সরাসরি কোনো আলোচনা হয়নি। তবে এর আগে লি জে মিয়ং এক চীন নীতির প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সম্মান জানানোর কথা বলেছিলেন, যদিও সামরিক সংঘাতে সরাসরি জড়ানোর বিপক্ষে অবস্থানও তুলে ধরেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌহার্দ্যের আবহ থাকলেও দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক অগ্রাধিকার দিতেই হবে। দেশটিতে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে সিউল ও ওয়াশিংটনের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে।
এদিকে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ খুঁজছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে এশীয় মিত্রদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ায় বেইজিং এই কৌশল নিতে পারে।
বৈঠকে ইয়েলো সাগরের সামুদ্রিক ইস্যুতেও আলোচনা হয়। দুই দেশ অঞ্চলটিকে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমুদ্রে পরিণত করার অঙ্গীকার করে এবং চলতি বছরই সামুদ্রিক সীমা নিয়ে উপমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে লি জে মিয়ংয়ের সফরসঙ্গী ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নির্বাহীরা। বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশ খাতে ১৪টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত বিরল খনিজের বড় অংশ আসে চীন থেকে এবং দেশটির চিপ রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজারও চীন।
চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে আগামী বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন এআই চিপ বাজারজাত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। পাশাপাশি চীন দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় পর্যটক উৎস দেশ।
আগের প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ নীতির কারণে চীন দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়েছিল। তবে শুল্ক যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সিউল এখন নিরাপত্তা ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছে।
রাষ্ট্রীয় ভোজের পর দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ও তাদের স্ত্রীরা একসঙ্গে ছবি তোলেন। লি জে মিয়ং সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে সম্পর্কের উষ্ণ দিকটি তুলে ধরেন। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, জনমত ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সম্পর্ক আরও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
















