চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি, নারীর পশ্চাৎপসরণ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির ফাঁদে আটকে থাকা বাস্তবতা
সরকারি পরিসংখ্যানে বেকারত্ব কম দেখালেও বাস্তবে কাজের গুণমান, নারী অংশগ্রহণ ও যুব কর্মসংস্থানে গভীর কাঠামোগত সঙ্কটের মুখে বাংলাদেশের শ্রমবাজার।
সংখ্যায় স্থিতিশীল মনে হলেও বাস্তবে গভীর বৈপরীত্যে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-এর শ্রমবাজার। একদিকে সরকারি হিসাবে বেকারত্বের হার কম, শ্রমশক্তির আকার বড় এবং প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ভাষ্য; অন্যদিকে বাস্তব চিত্র বলছে—কাজের মান খারাপ, নিরাপত্তাহীনতা ব্যাপক, নারীরা শ্রমবাজার থেকে সরে যাচ্ছেন এবং তরুণদের বড় অংশ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আটকে পড়ছে।
২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ কেবল কিছু সংখ্যা নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, উন্নয়ন মডেল ও সামাজিক কাঠামোর এক বাস্তব আয়না। এই আয়নায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—শ্রমবাজারে যে ‘স্থিতিশীলতা’ দেখা যাচ্ছে, তা মূলত কাঠামোগত সঙ্কট আড়াল করার পরিসংখ্যানগত আবরণ।
শ্রমশক্তি বাড়ছে, অংশগ্রহণ কমছে
২০২৪ সালে জাতীয় শ্রমশক্তি দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজারে। কিন্তু শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার নেমে এসেছে ৫৮.৯ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল ৬১.২ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মক্ষম বয়সী মানুষ বাড়লেও বড় একটি অংশ কাজের বাজারেই ঢুকছে না। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি নিরুৎসাহিত কর্মীবাহিনীর স্পষ্ট ইঙ্গিত।
নারীর পশ্চাৎপসরণ: নীরব কিন্তু গভীর সঙ্কট
শ্রমবাজারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া। ২০২৩ সালে যেখানে নারী শ্রমশক্তি ছিল ২ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজারে। অংশগ্রহণের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮.৪ শতাংশে। মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন সঙ্কট, কর্মস্থলের নিরাপত্তাহীনতা এবং ডে-কেয়ার অবকাঠামোর অভাব মিলিয়ে শ্রমবাজার নারীদের জন্য ক্রমেই অনুপযোগী হয়ে উঠছে।
চাকরিহীন প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা
২০২৪ সালে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৯ লাখে। অথচ একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারি ভাষ্য ইতিবাচক। এই বৈপরীত্যই নির্দেশ করে—দেশটি চাকরিহীন প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটছে। নতুন যে কাজ তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর বড় অংশ অস্থায়ী বা নারীদের জন্য অনুপযোগী।
বেকারত্ব কম, কিন্তু চাপ বেশি
সরকারি হিসাবে বেকারত্বের হার ৩.৬৬ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে। কঠোর সংজ্ঞা, নিরুৎসাহিত কর্মীদের বাদ পড়া, আধা-বেকারত্ব গণনায় না আসা এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজকে ‘কর্মসংস্থান’ ধরা—সব মিলিয়ে প্রকৃত চাপ সংখ্যার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
শিল্পায়নের ব্যর্থতা ও কৃষিতে প্রত্যাবর্তন
খাতভিত্তিক কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ ৪৮.৪৯ শতাংশ, শিল্পে মাত্র ১৭.২৬ শতাংশ। উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে যেখানে শিল্পের অংশ বাড়ার কথা, সেখানে বাংলাদেশে উল্টো মানুষ কম উৎপাদনশীল কৃষিতে ফিরছে। এটি শিল্পায়নের স্থবিরতার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি ও টিকে থাকার কর্মসংস্থান
মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৮ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। লিখিত চুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা বা ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা নেই এই শ্রমের। একই সঙ্গে স্বকর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়া উদ্যোক্তা অর্থনীতির শক্তি নয়; বরং এটি টিকে থাকার অর্থনীতির প্রতিফলন।
যুব শ্রমশক্তি: সম্ভাবনা থেকে ঝুঁকিতে
১৫–২৯ বছর বয়সী যুব শ্রমশক্তি নেমে এসেছে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজারে। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের সংযোগ দুর্বল হওয়ায় তরুণরা না দক্ষতা পাচ্ছে, না কাজ—ফল হিসেবে বাড়ছে হতাশা, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাস্তবতায় শ্রমবাজার সংস্কার আর নীতিগত বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় টিকে থাকার শর্ত। শিল্প ও উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান, নারী ও যুবদের জন্য নিরাপদ কাজ, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমকে ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা—এগুলো ছাড়া সংখ্যার আড়ালে লুকানো এই সঙ্কট আরও গভীর হবে।
















