বিশ্বকে বিস্মিত করে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিয়ে যায়। এই অভিযানের পেছনে ছিল কয়েক মাসের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি, যার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় মোড় আসে।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদুরোকে আটক করার অভিযানকে আমেরিকার ইতিহাসে সামরিক শক্তি ও দক্ষতার অন্যতম বড় প্রদর্শন হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রয়োগগুলোর একটি।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ২০১১ সালে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর এটিই ছিল ওয়াশিংটনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের সামরিক অভিযান। ৬৩ বছর বয়সী মাদুরোকে আটক করার খবর দ্রুতই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ অভিযোগ ঘিরে কয়েক মাস ধরে হুমকি ও উত্তেজনা বাড়ছিল। এরই মধ্যে ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র এবং সন্দেহভাজন মাদক বহনকারী নৌযানে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এসব হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হলেও এর বৈধতা নিয়ে জাতিসংঘ ও আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে মাদুরোর গ্রেপ্তারে তথ্য দেওয়ার জন্য ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
এই সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাদুরোর অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। বিশেষ বাহিনী গোপনে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নেওয়ার মহড়া চালাতে থাকে। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অ্যাবসোলিউট রিজলভ’।
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, অভিযানের জন্য একই ধরনের একটি ভবনের আদলে প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার রাত ১১টা ৪৬ মিনিটে ট্রাম্প চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। আবহাওয়া সামান্য অনুকূলে আসতেই ২০টি ঘাঁটি থেকে প্রায় ১৫০টি যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করে।
অভিযানের অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করা হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে কারাকাস শহরের বড় অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। রাজধানীজুড়ে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ এটিকে স্বল্প সময়ের একটি সমন্বিত সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন, যার স্থায়িত্ব ছিল আধা ঘণ্টারও কম।
শনিবার ভোর ২টা ১ মিনিটে মার্কিন হেলিকপ্টার মাদুরোর বাসভবনে অবতরণ করে। সেখান থেকেই মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়। এ সময় কোনো সংঘর্ষ হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ভোর সাড়ে ৪টার মধ্যেই মাদুরোকে একটি মার্কিন বিমানবাহী জাহাজে তুলে নিউইয়র্কের উদ্দেশে পাঠানো হয়।
পরে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদুরোর একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে তাকে চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখা যায়। নিউইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড ঘাঁটিতে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিমানটি অবতরণ করে।
ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, কারাকাসসহ কয়েকটি রাজ্যে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এখনো নিহতের আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। নিউইয়র্ক টাইমসকে এক কর্মকর্তা জানান, অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, অভিযানে কিছু মার্কিন সদস্য আহত হলেও কেউ নিহত হয়নি।
হামলার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণে ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে এবং অনেক মানুষ আতঙ্কে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। কারাকাস থেকে দূরের উপকূলীয় শহর হিগুয়েরোতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, নতুন নেতৃত্ব গঠিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক দায়িত্ব তত্ত্বাবধান করবে। প্রয়োজনে সেখানে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা নেই।
ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ মাদুরোকে আটক করার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প আগেই বলেছেন, রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে চললে ভেনেজুয়েলা দখলের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে পুরো পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির ভেতরে ও বাইরে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
















