গত ২৫ বছরে প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। শতাব্দীর শুরুতে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য ডায়াল আপ সংযোগ ছিল বাস্তবতা, নেটফ্লিক্স মানে ছিল ডাকযোগে ডিভিডি পাঠানোর সেবা, আর স্মার্টফোন শব্দটিই ছিল অধিকাংশ মানুষের কাছে অজানা। আজ সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও অন্যান্য প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২৫ বছরে অর্থাৎ ২০৫০ সালের মধ্যে প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রায় আরও গভীরভাবে প্রভাব ফেলবে। মানুষের শরীর ও যন্ত্রের মধ্যে সীমারেখা অনেকটাই মুছে যেতে পারে।
ন্যানো প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের চিপে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র ট্রানজিস্টরই এর উদাহরণ। লন্ডন সেন্টার ফর ন্যানোটেকনোলজির অধ্যাপক স্টিভেন ব্রামওয়েলের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মানুষের শরীরের ভেতর ব্যবহৃত হতে পারে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগ সহজ করার জন্য। ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ন্যানো যন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
সাইবারনেটিক্স গবেষক কেভিন ওয়ারউইক আরও এক ধাপ এগিয়ে ভাবছেন। তিনি নিজেই ১৯৯৮ সালে স্নায়ুতন্ত্রে মাইক্রোচিপ প্রতিস্থাপন করে আলোচনায় আসেন। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে মস্তিষ্কে ইলেকট্রনিক উদ্দীপনা দিয়ে কিছু মানসিক রোগের চিকিৎসা সম্ভব হতে পারে। এমনকি মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে থেকেও কাজ করতে পারবে।
বিজ্ঞান জাদুঘর গ্রুপের পরিচালক রজার হাইফিল্ড বলছেন, ডিজিটাল টুইন নামে ভার্চুয়াল সংস্করণ আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। মানুষের শরীরের তথ্য ব্যবহার করে তৈরি এসব ডিজিটাল সংস্করণে ওষুধ বা জীবনধারার পরিবর্তনের প্রভাব আগে থেকেই পরীক্ষা করা যাবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বিনিয়োগ ভবিষ্যতে জটিল সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব করবে। এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং মনে করেন, আগামী দুই দশকের মধ্যে কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার বাস্তবতা হয়ে উঠবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও এআই বড় ভূমিকা নেবে। ভবিষ্যৎবিদ ট্রেসি ফলোসের মতে, এআই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে পাঠদানের ধরন বদলাতে পারবে। বইয়ের বদলে থাকবে ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা ও সিমুলেশন, আর শিক্ষার্থীদের জিনগত ও শারীরিক তথ্যের ভিত্তিতে শেখার পদ্ধতি নির্ধারিত হতে পারে।
পরিবহন ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় গাড়ির বিস্তার ট্রাফিক জট কমিয়ে দেবে বলে ধারণা লেখক বিল ডগলাসের। তাঁর মতে, চালকবিহীন গাড়ি কাছাকাছি চলতে পারবে এবং দুর্ঘটনার হার অনেক কমে যাবে।
পৃথিবীর বাইরে মহাকাশেও বড় অগ্রগতি প্রত্যাশা করছেন বিশ্লেষকেরা। সাংবাদিক সু নেলসনের ধারণা, ২৫ বছরের মধ্যে চাঁদে বসবাসযোগ্য ঘাঁটি তৈরি হতে পারে এবং মহাকাশে ওষুধ উৎপাদনের মতো শিল্প গড়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনি চলচ্চিত্র মাইনরিটি রিপোর্টে যেভাবে ২০৫০ দশকের প্রযুক্তি কল্পনা করা হয়েছিল, তার অনেক কিছুই আজ বাস্তবতার পথে। যদিও এসব কল্পনা কখনো আশাবাদী, কখনো উদ্বেগের। তবে বিজ্ঞান লেখক ফিলিপ কে ডিক একসময় বলেছিলেন, বিজ্ঞান মানুষের জীবন রক্ষায় বেশি ভূমিকা রেখেছে, ক্ষতির চেয়ে উপকারই বেশি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সালের পৃথিবী প্রযুক্তিনির্ভর হলেও মানুষের কল্যাণই হওয়া উচিত এর মূল লক্ষ্য।
















