ওয়াশিংটন ও কারাকাস — যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, ব্যাপক সামরিক হামলার মধ্যেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে তীব্র চমক সৃষ্টি হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সরকার এখনো মাদুরো ও তার স্ত্রীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক অডিও বার্তায় তিনি বলেন, তারা জীবিত আছেন কি না সে বিষয়ে প্রমাণ দাবি করছে সরকার।
এই নাটকীয় পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বাহিনীর ধারাবাহিক হামলা। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব অভিযানে মাদক পাচারে জড়িত নৌযান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং ভেনেজুয়েলার কথিত মাদকবাহী নৌকার একটি নোঙরস্থলেও আঘাত হানা হয়েছে।
মাদুরোকে আটক করার খবর অনেকের কাছে অতীতের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র পানামার নেতা মানুয়েল নোরিয়েগা ও ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছিল।
পানামার নোরিয়েগা
১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র পানামায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির সামরিক শাসক ও কার্যত নেতা মানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র নাগরিকদের নিরাপত্তা, দুর্নীতি, গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ও মাদক পাচারের অভিযোগকে অভিযানের যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এর আগে ১৯৮৮ সালে মায়ামিতে নোরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা করে যুক্তরাষ্ট্র, যেমনটি মাদুরোর ক্ষেত্রেও করা হয়েছে। নোরিয়েগা ১৯৮৫ সালে পানামার প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগে বাধ্য করেন, ১৯৮৯ সালের নির্বাচন বাতিল করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব উসকে দেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। পরে নোরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে বিচার করা হয় এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে কারাবন্দি রাখা হয়। এরপর তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে আবার পানামায় ফেরত আনা হয়। ২০১৭ সালে পানামার কারাগারেই তার মৃত্যু হয়।
সাদ্দাম হোসেন
ইরাক আক্রমণের প্রায় নয় মাস পর ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক দখল করেছিল।
আশির দশকে ইরান ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম দীর্ঘদিন ওয়াশিংটনের মিত্র ছিলেন। ২০০৩ সালের যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, তিনি আল কায়েদার মতো গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছেন, যদিও পরে এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি এবং ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্রও পাওয়া যায়নি।
সাদ্দামকে তার নিজ শহর তিকরিতের কাছে একটি গর্তে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় আটক করা হয়। পরে ইরাকি আদালতে তার বিচার হয় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
হন্ডুরাসের হুয়ান অরলান্ডো হার্নান্দেজ
আরেকটি আলোচিত উদাহরণ হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরলান্ডো হার্নান্দেজ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট ও হন্ডুরাসের নিরাপত্তা বাহিনী তাকে তার বাসভবন থেকে আটক করে।
দুর্নীতি ও মাদক পাচারের অভিযোগে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং ২০২২ সালের জুনে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই হন্ডুরাসের প্রধান কৌঁসুলি তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন, যা দেশটির রাজনৈতিক ও আইনি অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
















