সূর্যের এত কাছে, আকারে এত ছোট, অথচ ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভারী ধাতব হৃদয় নিয়ে বুধ গ্রহ বহু দিন ধরেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ে রেখেছে। সৌরজগতের এই ক্ষুদ্রতম গ্রহটি যেন প্রকৃতির নিয়মকে অস্বীকার করেই টিকে আছে। বিজ্ঞানীদের অনেকেই বলেন, বুধের অস্তিত্বই এক প্রশ্নবোধক।
দূর থেকে তাকালে বুধকে নিরস, প্রাণহীন এক পাথুরে গোলক বলেই মনে হয়। খাঁজকাটা গহ্বর, পোড়া ভূমি, অতীত জলচিহ্নের অভাব, প্রায় নেই বললেই চলে এমন বায়ুমণ্ডল। জীবনের কোনো সম্ভাবনা এখানে কল্পনাতীত। কিন্তু গভীরে তাকালেই দেখা যায়, এই গ্রহের জন্মকথা যেন সৌরজগতের সবচেয়ে বড় ধাঁধাগুলোর একটি।
পৃথিবীর তুলনায় প্রায় বিশ গুণ হালকা বুধ, আকারে অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও সামান্য বড়। অথচ ঘনত্বের দিক থেকে পৃথিবীর পরেই তার অবস্থান। কারণ, বুধের প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে বিশাল এক লৌহসমৃদ্ধ কেন্দ্র, যার ওপর পাতলা পাথুরে আবরণ মাত্র। এমন গঠন সৌরজগতের অন্য কোনো গ্রহের সঙ্গে মেলে না।
বুধের কক্ষপথও রহস্যে মোড়া। সূর্যের এত কাছাকাছি অবস্থানে এমন একটি গ্রহ কীভাবে তৈরি হলো, তা আজও পরিষ্কার নয়। গ্রহ গঠনের প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, এখানে এমন একটি জগতের জন্ম হওয়ারই কথা নয়। ফ্রান্সের বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহগঠন বিশেষজ্ঞ শন রেমন্ড বলেন, এই প্রশ্নের সামনে বিজ্ঞানীরাও যেন বিব্রত।
এই অজানা গল্পের কিছু পৃষ্ঠা খুলে দিতে পারে ইউরোপ ও জাপানের যৌথ মহাকাশ অভিযান বেপিকোলোম্বো। ২০১৮ সালে উৎক্ষেপণের পর দীর্ঘ যাত্রা শেষে ২০২৬ সালের নভেম্বরে বুধের কক্ষপথে প্রবেশ করার কথা এই মহাকাশযানের। এক দশকেরও বেশি সময় পর আবার কোনো যন্ত্র বুধকে ঘিরে ঘুরবে, তার গঠন, উপাদান ও অভ্যন্তরীণ রহস্য খুঁজে দেখবে।
বুধকে বোঝা মানে শুধু একটি গ্রহকে জানা নয়। এর মাধ্যমে সৌরজগতের জন্মকথা এবং অন্য নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো অদ্ভুত গ্রহগুলোর রহস্যও উন্মোচিত হতে পারে। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, বুধ আমাদের কাছে থাকা সবচেয়ে কাছের এক্সোপ্ল্যানেটের মতোই ব্যতিক্রমী।
১৯৭০ এর দশকে নাসার মেরিনার টেন মহাকাশযান প্রথমবার বুধের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়ে তার অস্বাভাবিক ঘনত্বের ইঙ্গিত দেয়। পরে মেসেঞ্জার মিশন সেই রহস্য আরও ঘনীভূত করে। প্রচণ্ড তাপের এই গ্রহে সূর্যের আলোয় উবে যাওয়ার কথা যেসব উদ্বায়ী উপাদানের, সেগুলোর অস্তিত্বই ধরা পড়ে। এমনকি চিরছায়াময় মেরু অঞ্চলে বরফ জমে থাকার প্রমাণও মেলে।
তাহলে কি বুধ একসময় অনেক বড় ছিল। কোনো ভয়াবহ সংঘর্ষে তার বাইরের স্তর ছিটকে গিয়ে শুধু ভারী কেন্দ্রটি টিকে গেছে। নাকি সে নিজেই ছিল এক ঘাতক, অন্য গ্রহে আঘাত হেনে নিজের রূপ বদলে নিয়েছে। আবার কেউ বলেন, সূর্যের কাছাকাছি অঞ্চলের ভারী ধাতব ধুলো থেকেই বুধের জন্ম, যেখানে হালকা উপাদান টিকে থাকতে পারেনি।
প্রতিটি তত্ত্বের সঙ্গেই আছে প্রশ্ন। এত বড় সংঘর্ষ হলে উদ্বায়ী উপাদানগুলো বাঁচল কীভাবে। আবার সূর্যের কাছে গড়ে উঠলে বুধ কেন এত ছোটই থেকে গেল। এমনকি ধারণা আছে, বুধ একসময় অন্য গ্রহগুলোর সঙ্গে ভেতরের দিকে জন্ম নিয়ে পরে একা পড়ে যায়, উপাদান ফুরিয়ে তার বৃদ্ধি থেমে যায়।
বেপিকোলোম্বো মিশন এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর দিতে পারে। গ্রহের পৃষ্ঠের রাসায়নিক গঠন, ভেতরের কেন্দ্রের প্রকৃতি, দুর্বল চৌম্বক ক্ষেত্র সবকিছু মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা বুধের জন্মকথার মানচিত্র আঁকতে চান। যদি কখনো বুধের মাটি পৃথিবীতে আনার সুযোগ হয়, তবে সেই রহস্যের দরজা আরও খুলে যাবে।
আজও বুধ তার ধূসর, ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে সূর্যের চারপাশে ঘুরে চলেছে। বাইরে থেকে নিস্তব্ধ, ভেতরে ইতিহাসের গোপন আগুন। হয়তো সে এক বিরল দুর্ঘটনার ফল, হয়তো গ্রহ গঠনের স্বাভাবিক পরিণতি। নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু একথা স্পষ্ট, সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট এই গ্রহটি রহস্যের দিক থেকে সবচেয়ে বড়।
















