যুব আন্দোলন নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার ও দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভে উত্তাল রয়েছে বাংলাদেশ। শনিবার ঢাকায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হলেও দেশজুড়ে উত্তেজনা অব্যাহত থাকে। বিক্ষোভকারীরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পদত্যাগের দাবিও নতুন করে তুলেছেন।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চলমান সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই অস্থির পরিস্থিতি আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনকে ভণ্ডুল করতে ব্যবহৃত হতে পারে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না।
শনিবার দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কয়েক দশক মানুষ জাতীয় সংসদের কাছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে হাদির জানাজায় অংশ নেন। বিশাল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশ বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করে এবং প্রায় এক হাজার বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়।
হাদির সহপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের সম্পাদক আবদুল্লাহ আল জাবের জানাজার আগে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন।
দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর শোকাহত জনতা শাহবাগ মোড়ের দিকে মিছিল নিয়ে যায়। সেখানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’সহ নানা স্লোগান দেওয়া হয়। কেউ কেউ শাহবাগের নাম পরিবর্তন করে ‘হাদি চত্বর’ করার দাবিও তোলে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানাজার আগে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় উপস্থিত হয়ে বলেন, শরিফ ওসমান হাদি কখনো বিস্মৃত হবেন না এবং তিনি জাতির জন্য যে শিক্ষা রেখে গেছেন, তার মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন। তিনি বলেন, হাদি নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন এবং সেই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি কেমনভাবে নির্বাচন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
দেশের কিছু এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে শুরু করলেও সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ রয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়া প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার শনিবার আবার প্রকাশনা শুরু করেছে।
এদিকে, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নেতারা অভিযোগ করেছেন, আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ঠেকাতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, এই আগুনে ৫৫ বছরের সাংস্কৃতিক সংগ্রহ ধ্বংস হয়ে গেছে, যা বাংলাদেশের প্রগতিশীল সংস্কৃতি ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল হাদির হত্যা ও পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও ছায়ানট কার্যালয়ে হামলা এবং সাংবাদিকদের হয়রানির ঘটনাও নিন্দা করেছে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক হিন্দু পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। ওই ঘটনায় শনিবার সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
দেশজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা আদৌ সম্ভব হবে কি না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি ও নির্বাচনবিরোধী গোষ্ঠী এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে ভোট পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করতে পারে। তিনি জনগণকে এসব চক্রান্তের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
















