আগুন, হামলা আর অপপ্রচারের মুখেও স্বাধীন সাংবাদিকতার দায় অটল
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা প্রমাণ করেছে—স্বৈরতন্ত্রের পতনের পরও বাক্স্বাধীনতা নিরাপদ নয়। আগুন, লুটপাট ও ভয় দেখানোর মাঝেও সত্য প্রকাশের অঙ্গীকারে অবিচল থাকার ঘোষণা এই লেখার কেন্দ্রে।
গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পতনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, বাংলাদেশ হয়তো এবার সত্যিকার অর্থে বাক্স্বাধীনতার পথে হাঁটবে। কিন্তু ১৮ ডিসেম্বরের রাত সেই আশার ওপর কঠিন আঘাত হেনেছে। সংঘবদ্ধ হামলাকারীরা রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। সংবাদকর্মীরা যখন ভেতরে আতঙ্কে আটকে, বাইরে তখন উল্লাস—আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল ন্যূনতম ও নিষ্ক্রিয়।
এই হামলা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই গণতন্ত্রবিরোধী উগ্র গোষ্ঠীগুলো পরিকল্পিত অপপ্রচার চালিয়ে আসছিল। নিহত জুলাই আন্দোলনের সংগঠক শরিফ ওসমান হাদির নাম ব্যবহার করে আবেগকে উসকে দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে—যেখানে হাদি নিজেই বলেছিলেন, সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে হুমকি দেওয়ার কোনো নৈতিকতা নেই।
ইতিহাস সাক্ষী, আওয়ামী লীগ সরকারের শুরু থেকেই প্রথম আলো ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় রোষের শিকার হয়েছে—মামলা, বিজ্ঞাপন বন্ধ, সাংবাদিক গ্রেপ্তার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর ‘জাল ভোট, কলঙ্কিত নির্বাচন’ শিরোনাম সরকারকে ক্ষুব্ধ করেছিল। ২০১৫ সালে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধের চেষ্টা, ২০২৩ সালে সাংবাদিক শামসুজ্জামানকে কারাবরণ—সবই ছিল একই ধারাবাহিকতার অংশ।
জুলাই–আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে চাপ উপেক্ষা করে প্রথম আলো আন্দোলনের সত্য তুলে ধরেছিল—নিহত-আহতের হিসাব, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কণ্ঠ। তথ্যের সেই দুঃসময়ে পাঠকের ভরসা হয়ে ওঠার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু স্বৈরাচার পতনের পরও যে আগুন জ্বলে উঠল, তা প্রমাণ করে—গণতন্ত্রের লড়াই এখনো অসম্পূর্ণ।
একটি দেশের গণতন্ত্রের মানদণ্ড মাপা যায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দিয়ে। বাংলাদেশে সেই ব্যারোমিটার কখনোই স্বস্তিদায়ক ছিল না। তবু শুরু থেকেই প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নীতি ছিল স্পষ্ট—দলনিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠতা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মর্যাদা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে অবিচল থাকা।
১৮ ডিসেম্বরের রাত শুধু সংবাদমাধ্যমের নয়, গণতন্ত্রের জন্যও কালো রাত। তবু সেই অন্ধকারের মধ্যেই দৃঢ় ঘোষণা—মাথা নোয়াবার নয়। আগুনে পুড়েও ফিরে আসা মানে কেবল প্রকাশনা চালু করা নয়; সত্য প্রকাশের দায় আরও গভীরভাবে গ্রহণ করা। পাঠকের পাশে থাকা, ভয় উপেক্ষা করে প্রশ্ন তোলা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এই অঙ্গীকারের মূল।
এই দেশ কঠিন সময় পার করছে। অতীতেও চাপ ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু সত্য বলা বন্ধ হলে গণতন্ত্র শ্বাস নেয় না। তাই আগুনের পরও কলম থামবে না—এই প্রতিশ্রুতিই এখন সবচেয়ে রাজনৈতিক, সবচেয়ে নাগরিক অবস্থান।















