চার দশক পেরিয়ে গেছে, তবু রুয়ান্ডার ভিরুঙ্গা পাহাড়ে আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায় ডায়ান ফসির নাম। যিনি গরিলাদের নিয়ে মানুষের চোখে জমে থাকা ভয় আর ভুল ধারণার দেয়াল ভেঙে দিয়েছিলেন, যিনি প্রমাণ করেছিলেন—এই বিশাল প্রাণীগুলো হিংস্র দানব নয়, বরং কোমল হৃদয়ের সামাজিক জীব, আমাদেরই প্রতিবিম্ব। অথচ সেই নারীই শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিলেন তাদের বাঁচাতে গিয়ে, রহস্যে মোড়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে।
ডায়ান ফসির গবেষণার আগে পাহাড়ি গরিলাদের মানুষ চিনত ভয়ংকর খুনি হিসেবে। শিকারিদের গল্প, চলচ্চিত্রের দৃশ্য—সব মিলিয়ে গরিলা মানেই আতঙ্ক। কিন্তু রুয়ান্ডার গভীর অরণ্যে গরিলাদের সঙ্গে বসবাস করে ফসি সেই মিথ ভেঙে দেন। ধীরে ধীরে তাদের আচরণ অনুকরণ করে, তাদের ভাষা শেখার চেষ্টা করে তিনি অর্জন করেন গরিলাদের আস্থা। মানুষের চোখে ধরা পড়ে গরিলাদের পারিবারিক বন্ধন, ব্যক্তিত্ব, ভালোবাসা আর নেতৃত্বের গল্প।
১৯৬৭ সালে রুয়ান্ডার ভিরুঙ্গা পর্বতমালায় কারিসোকি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলেন ফসি। তখন পৃথিবীতে পাহাড়ি গরিলার সংখ্যা ছিল পাঁচ শতেরও কম। চাষাবাদ, গবাদিপশুর অনুপ্রবেশ, যুদ্ধ আর চোরাশিকার—সব মিলিয়ে তারা ছিল বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। ফসি বুঝেছিলেন, সময় ফুরিয়ে আসছে।
নীরব, ধৈর্যশীল এই গবেষক গরিলাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুললেন। তিনি দেখালেন, কীভাবে প্রতিটি গরিলা পরিবারে রূপালি পিঠের নেতা পুরো দলের নিরাপত্তা আর শৃঙ্খলা রক্ষা করে। তার গবেষণা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। ১৯৭০ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রচ্ছদে জায়গা পান তিনি। গরিলাদের গল্প প্রথমবারের মতো ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
কিন্তু অরণ্যের নীরবতায় আরেকটি যুদ্ধ চলছিল। চোরাশিকারি আর ভূমিদখলকারীদের বিরুদ্ধে ফসির লড়াই দিন দিন হয়ে উঠছিল কঠোর, কখনও উগ্র। সহকর্মীদের ভাষায়, তিনি ছিলেন একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও ভয়ংকর—এক মুহূর্তে স্নেহশীল, পরক্ষণেই রণংদেহী। গরিলাদের প্রতি তার ভালোবাসা আর শিকারিদের প্রতি ঘৃণা তাকে ক্রমশ নিঃসঙ্গ করে তোলে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় আসে ১৯৭৭ সালে। তার প্রিয় গরিলা ডিজিটকে চোরাশিকারিরা হত্যা করে। মাথা ও হাত কেটে নেওয়া হয় স্মারক হিসেবে বিক্রির জন্য। সেই দৃশ্য ফসিকে ভেঙে দেয়। তিনি নিজেই লেখেন, এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন। এর পর থেকে তিনি আরও একা হয়ে পড়েন, বিষণ্নতা আর ক্ষোভে ডুবে যান।
ডিজিটের মৃত্যুর পরও হত্যাযজ্ঞ থামেনি। আরও গরিলা মারা যায়, একটি শাবক আহত হয়ে পরে মৃত্যুবরণ করে। ফসি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, এই সহিংসতার পেছনে শুধু চোরাশিকারি নয়, প্রশাসনিক অবহেলাও দায়ী। তার সন্দেহ আর ক্ষোভ স্থানীয়দের প্রতি আরও গভীর হয়।
১৯৮৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর, সেই লড়াইয়েরই ভয়াবহ পরিণতি আসে। নিজের কেবিনে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ডায়ান ফসিকে। ঘর তছনছ করা হয়েছিল, কিন্তু মূল্যবান কিছু নেওয়া হয়নি। কে তাকে হত্যা করল, কেন করল—আজও তার উত্তর মেলেনি। তদন্ত ছিল অগোছালো, প্রমাণ হারিয়ে যায় সময়ের ধুলোয়।
অনেকে সন্দেহ করেন চোরাশিকারিদের, কেউ কেউ বলেন চোরাচালানকারীদের কথা। নিশ্চিত শুধু একটাই—ফসি জানতেন তার জীবন ঝুঁকিতে। তবু তিনি পিছু হটেননি।
মৃত্যুর আগে ফসি আশঙ্কা করেছিলেন, ১৫ বছরের মধ্যে পাহাড়ি গরিলা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তিনি ভুল ছিলেন। তার মৃত্যুর পর করা জরিপে দেখা যায়, গরিলার সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। আজ বিশ্বে পাহাড়ি গরিলার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে।
ডায়ান ফসির জীবন ছিল বিতর্কে ভরা, ভুলে ভরা, কিন্তু তার উত্তরাধিকার অস্বীকার করার উপায় নেই। তার হাত ধরেই পাহাড়ি গরিলারা বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা পেয়েছে। ভিরুঙ্গা পাহাড়ে আজও তিনি শুয়ে আছেন, তার প্রিয় ডিজিটের পাশে। গরিলাদের সঙ্গে তার আত্মত্যাগের গল্প এখনো প্রকৃতির পাতায় লেখা থাকে, নীরবে, গভীর শ্রদ্ধায়।
















