গাজার আকাশে এখনো ধোঁয়া, মাটিতে এখনো রক্তের দাগ। এই বাস্তবতার মধ্যেই যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র মায়ামিতে বসতে যাচ্ছে কাতার, তুরস্ক ও মিসরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। ফ্লোরিডার এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ অংশ নেবেন বলে নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউস।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের চালানো ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ থামাতে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়েই এই আলোচনা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার দাবি সত্ত্বেও প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ ঝরছে ফিলিস্তিনিদের।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, শুক্রবার নির্ধারিত বৈঠকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলআত্তি উপস্থিত থাকবেন। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে সীমিত পরিসরের নিরাপত্তা বৈঠক করছেন বলেও খবর এসেছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি গাজা প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে হামাসকে নিরস্ত্র করার অজুহাতে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে তেল আবিব। যদিও একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় আপাত শান্তি ধরে রাখতে আগ্রহী।
মাঠের বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। শুক্রবার খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও ভারী গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। তথাকথিত ইয়েলো লাইনের ভেতরের এলাকাগুলোতেও হামলা হয়েছে, যেখানে যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল। আল-আকসা টিভির খবরে বলা হয়েছে, এসব হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন নারী। গাজার উপকূলে মাছ ধরার নৌকাতেও গুলি চালিয়েছে ইসরায়েলি নৌযান।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির ৬৯ দিনের মধ্যে ৫৮ দিনেই গাজায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। মাত্র ১১ দিন ছিল এমন, যেদিন কোনো মৃত্যু বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্প জানিয়েছেন, বড়দিনের ছুটিতে নেতানিয়াহু তার সঙ্গে ফ্লোরিডায় দেখা করতে পারেন। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ দ্রুত শুরু করতেই এই কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কাতার ও মিসর, যারা এই যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী ও নিশ্চয়তা প্রদানকারী, তারা দ্বিতীয় ধাপে দ্রুত অগ্রগতির আহ্বান জানিয়েছে। এই ধাপে ইসরায়েলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে।
এদিকে হামাসের এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, মায়ামির আলোচনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গাজায় ইসরায়েলের ধারাবাহিক লঙ্ঘন বন্ধ করা। তার ভাষায়, ফিলিস্তিনিরা চায় এই আলোচনা যেন দখলদার বাহিনীকে আইন মানতে বাধ্য করে এবং মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে প্রবেশের পথ খুলে দেয়। রাফাহ সীমান্ত খুলে দেওয়া, পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশ এবং ভবিষ্যতে একটি টেকসই রাজনৈতিক পথরেখাও আলোচনায় আসা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী আগেই সতর্ক করেছেন, প্রতিদিনের লঙ্ঘনে পুরো যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফিলিস্তিনি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষায়, এটি নামমাত্র যুদ্ধবিরতি, বাস্তবে নয়।
গাজার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল অন্তত ৭৩৮ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। গুলি, বোমা হামলা, অনুপ্রবেশ ও গ্রেপ্তারে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে উপত্যকাটি। মানবিক সহায়তা আটকে রেখে ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংসের ধারাও থামেনি।
এর ওপর যোগ হয়েছে প্রকৃতির আঘাত। সাম্প্রতিক ঝড়ে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় ভেঙে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, পানিতে ডুবে গেছে শরণার্থী শিবিরের তাঁবু। দুই বছরের যুদ্ধে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে, হাজারো পরিবার ঠাঁই নিয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়ে।
এই ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই এখন কূটনীতির ভাষা খোঁজা হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই, আলোচনার টেবিল থেকে কি সত্যিই শান্তির আলো পৌঁছাবে গাজার অশ্রুসিক্ত মানুষের কাছে?
















