হংকং যখন টাই পো এলাকার ওয়াং ফুক কোর্টে ভয়াবহ আগুনে কমপক্ষে ১৫৯ মানুষের মৃত্যুতে শোকের ঢেউ সামলাতে চেষ্টা করছে, তখন আবারও ভেসে উঠছে ২০১৯ সালের অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও ক্ষোভের ছায়া। যেন আগুন শুধু ইটপাথর নয়, পোড়াচ্ছে মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা পুরনো ক্ষতও।
২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় শুরু হয় আগুন। উচ্চ ভবনের একটির নিচতলা থেকে শুরু হওয়া সেই দাউদাউ আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো আবাসিক কমপ্লেক্সে—আটটি টাওয়ারের মধ্যে সাতটিতে। বহু বাসিন্দা আটকে পড়েন, কারণ জরুরি অ্যালার্ম নাকি ঠিকমতো কাজই করেনি। আগুন নেভাতে লাগে চল্লিশ ঘণ্টার বেশি।
এত বড় বিপর্যয় আধুনিক হংকং-বাসী কল্পনাও করতে পারেনি। অনেকেই বিস্মিত, ক্ষুব্ধ—একদম শহরের কেন্দ্রে এমন ভয়াবহ আগুন কীভাবে ছড়াল, কেন থামানো গেল না।
আগুনের পরপরই সাধারণ হংকংবাসীর প্রতিক্রিয়া ছিল ২০১৯ সালের আন্দোলনের দিনের মতোই—অসামান্য সমবেদনা, সাহায্যের হাত, স্বতঃস্ফূর্ত সংগঠন। কেউ খাবার এনেছে, কেউ কাপড়, কেউ আবার আশ্রয়। অনলাইনে তৈরি হয়েছে সহায়তার তালিকা, রাস্তার দেয়ালে ফুটে উঠেছে হাতে লেখা বার্তা—যেন আবারও ফিরে এসেছে সেই ‘লেনন ওয়াল’-এর স্মৃতি।
এখনো অনেক উত্তর অমীমাংসিত। কেন এমন হলো, সংস্কারের নামে করা কাজ কি আসলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল, না কি বিপর্যয়েরই বীজ বপন করেছিল? অগ্নি তদন্তে জানা গেছে—বাঁশের মাচা নয়, নিম্নমানের নেটিং আর স্টাইরোফোমের মতো উপাদান আগুন ছড়ানোর মূল কারণ।
শহরের অনেকেই বিশ্বাস করেন, সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল ধীর এবং অগোছালো। তাই সাধারণ মানুষকে এত বড় পরিমাণে এগিয়ে আসতে হয়েছে। ২০১৯ সালের আন্দোলনের পর থেকে যে অবিশ্বাস জন্মেছে, এই ঘটনার পর তা আবারও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
অনলাইনে উঠেছে প্রশ্ন—সরকার কি সত্যিই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে? আবারও উঠে এসেছে বিদেশি শক্তি, ‘বিভ্রান্তিকর প্রচারণা’ ইত্যাদির অভিযোগ—যা খুবই পরিচিত ২০১৯ সালের ভাষ্যে।
এদিকে, আগুনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে অন্তত ১৫ জনকে। অন্যদিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আরও তিনজনকে আটক করা হয়েছে—একজন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক, প্রাক্তন জেলা কাউন্সিলর কেনেথ চ্যাং, আর এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—বিচ্ছিন্নতা উসকে দেওয়া, বিভ্রান্তি ছড়ানো।
সরকার বলছে—আইনই শেষ কথা। কেউ সংবেদনশীল সময়ে আইন ভাঙার চেষ্টা করলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিহতদের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছে প্রশাসন, দিয়েছে বিনামূল্যে অস্থায়ী আবাসন ও ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি। শহরের প্রধান নির্বাহী জন লি ঘোষণা করেছেন—একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি হবে, পর্যালোচনা করা হবে ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
অবশ্য এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা পদত্যাগ করেননি।
তবু সবচেয়ে বড় ব্যথা—যে মানুষগুলো আর ফিরবে না। ওয়াং ফুক কোর্টের ছাইচাপা ঘরগুলোতে ফিরে পাওয়া যাবে নতুন দেয়াল, নতুন ছাদ—কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জীবনগুলোকে আর ফেরানো যাবে না।
হংকংয়ের এই ট্র্যাজেডি তাই শুধু আগুনের ইতিহাস নয়, মানুষের অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ আর দীর্ঘদিনের না-বলা প্রশ্নগুলোর প্রতিধ্বনি। শহরটি আবারও এক কঠিন সময় পার করছে—যেখানে ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার পরও থেকে যাচ্ছে অদৃশ্য জ্বালা, অবিশ্বাসের গন্ধ, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর দুশ্চিন্তা।
















