রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি প্রচেষ্টা যখন বারবার ভেস্তে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় আরও আগ্রাসী সুরে কথা বলছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ওডেসা ও মাইকোলাইভ দখলের হুমকিতে তিনি যুদ্ধের দিগন্তকে আরও অন্ধকার করে তুলেছেন—এমনকি ইউরোপেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সপ্তাহের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। একই সঙ্গে দাবি করেছে, তারা পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর পোকরোভস্ক দখল করেছে। আরও জানিয়েছে ভভচানস্ক ও কুপিয়ানস্ক থেকেও তারা ইউক্রেনীয় বাহিনীকে পিছু হটিয়েছে। তবে ইউক্রেন এসব দাবিকে সরাসরি ‘যুদ্ধ-প্রচারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্ব জানিয়েছে, পোকরোভস্কে লড়াই এখনো চলছে, শহরের উত্তরাংশে তারা অবস্থান ধরে রেখেছে। কুপিয়ানস্কেও রুশ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে তাদের বাহিনী। নিজেদের দেশকে রক্ষার এই সংগ্রামে তারা দাবি করেছে—রাশিয়ার কথিত ‘জয়ের ঘোষণা’ কেবল বিদেশি কূটনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা।
এইসব সামরিক উত্তেজনার ভেতরেই কিয়েভে আরেকটি রাজনৈতিক ঝড়: দুর্নীতির অভিযোগে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার পদচ্যুতি। যখন শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন সরকারের এই অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মাঝে দীর্ঘ আলোচনার পর যেসব নথি মস্কোতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো নিয়ে তারা পাঁচ ঘণ্টা বৈঠক করেছে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। কিন্তু রাশিয়া স্পষ্ট বলেছে—এখনো তারা কোনো প্রস্তাবে একমত নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ড, দখলকৃত প্রদেশ, ভবিষ্যৎ সীমান্ত—সবই আলোচনায় এসেছে, কিন্তু কোনো সমাধান নয়।
রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চল এখনো নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। বিচ্ছিন্ন যুদ্ধ, অগণিত প্রাণহানি, ধ্বংসস্তুপে ডুবে থাকা শহর—সবকিছুর পরও পুতিন বিশ্বাস করেন, দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ তাদের পক্ষেই কাজে দেবে।
পুতিনের ভাষ্য আরও উদ্বেগজনক। তিনি বলেছেন, পোকরোভস্ক দখল তাদের যুদ্ধ লক্ষ্যের পথে “গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি”। শুধু তাই নয়—ইউক্রেনকে সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও দিয়েছেন। ওডেসা ও মাইকোলাইভের দিকে তার দৃষ্টি—যেন যুদ্ধের তরঙ্গ আরও উত্তাল করে তুলতে প্রস্তুত।
শান্তির প্রশ্নে তিনি বলেন, “যেদিন ইউক্রেনীয় সেনারা তাদের দখলকৃত অঞ্চল ছেড়ে যাবে, সে দিনই যুদ্ধ থামবে। না হলে আমরা শক্তি দিয়ে তাদের সরিয়ে দেব।” একই সঙ্গে ইউরোপকে সতর্ক করে বলেন, “আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু যদি ইউরোপ লড়াই করতে চায়—আমরা এখনই প্রস্তুত।”
মাঠে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাশিয়া ছুড়েছে প্রায় ১১০০ ড্রোন ও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র। ইউক্রেনের আকাশরক্ষা বাহিনী শত শত ড্রোন নামালেও, প্রাণহানি থামেনি। দনিপ্রোতে অন্তত চারজন নিহত হয়েছে, আহত কয়েক ডজন।
ইউক্রেনও পাল্টা আঘাত হেনেছে রুশ জ্বালানি ও ড্রোন স্থাপনায়। সেরাটভের তেল শোধনাগার, এঙ্গেলস বিমানঘাঁটি, আলাবুগার ড্রোন কারখানা—সবই লক্ষ্যবস্তু হয়েছে তাদের আঘাতে। কৃষ্ণসাগরে রুশ তেলবাহী ডক ধ্বংসের দাবিও করেছে কিয়েভ।
রুশ অর্থনীতিকে চাপ দিতে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞাও আরও কঠোর হয়েছে। ইউক্রেনের উপদেষ্টারা বলছেন, বছরের শেষে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল উৎপাদন পাঁচ শতাংশ কমে আসবে, আর রপ্তানি কমবে ১৫-২০ শতাংশ।
যুদ্ধের দীর্ঘ রাত এখনো ভোর দেখেনি। শান্তি আলোচনা শীতের কুয়াশায় হারিয়ে যাচ্ছে, আর দুই দেশের সীমান্তে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে নতুন শোক, নতুন ক্ষত। ইউক্রেনের আকাশে ড্রোনের গুঞ্জন, রাশিয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি—সমগ্র ইউরোপ যেন এক অস্থির নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করছে ভবিষ্যতের অজানা শব্দের।
















