কেনিয়ার মাটিতে প্রশিক্ষণ নিতে আসা ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে আবারও উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের অভিযোগ—হত্যা, যৌন সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন আর পরিবেশ ধ্বংসের অগণিত ঘটনা। দেশটির সংসদীয় এক বিস্তৃত তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, স্থানীয় মানুষের চোখে এসব বিদেশি সেনারা যেন এক অদৃশ্য দখলদারের চেহারা নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয় দশক ধরে কেনিয়ার লাইকিপিয়া অঞ্চলে অবস্থানরত BATUK (British Army Training Unit in Kenya)–এর সদস্যরা ক্রমাগত এমন সব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, যেগুলো বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় মানুষদের মনে ক্ষতের মতো জমে ছিল। এর মাঝে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ২০১২ সালে ২১ বছর বয়সী কেনিয়ান তরুণী অ্যাগনেস ওয়ানজিরুর নির্মম হত্যাকাণ্ড, যা বিশ্বব্যাপী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
প্রতিরোধের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর স্থানীয় অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই প্রতিবেদন শুধু কেনিয়ার জন্য নয়, আফ্রিকার সেই সব দেশের জন্যও একটি জয়—যেখানে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি থাকলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা খুব সীমিত। “ব্রিটিশ সেনাবাহিনী আর আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এ কথা কেনিয়ার সংসদ প্রমাণ করেছে,” মন্তব্য করেন ACCPA নামক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা জেমস মওয়াঙ্গি।
BATUK কী এবং কেন তারা কেনিয়ায়?
১৯৬৩ সালে কেনিয়ার স্বাধীনতার পর থেকেই ব্রিটিশ সেনারা এখানে প্রশিক্ষণের জন্য অবস্থান করছে। প্রাকৃতিক আবহাওয়া ও যুদ্ধসদৃশ পরিবেশের কারণে এই অঞ্চল ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে আদর্শ। তারা স্থানীয় সেনাদের সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণও প্রদান করে।
ব্রিটিশ সরকার দাবি করে, BATUK স্থানীয় অর্থনীতিতে কোটি কোটি শিলিং অবদান রাখে, কাজ দেয় শত শত মানুষকে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ—যুদ্ধসামগ্রী অবহেলায় ফেলে রাখা, বিস্ফোরক ব্যবহারের পর না পরিষ্কার করা, এবং মহিলাদের প্রতি অনৈতিক আচরণ তাদের জীবনে দুর্ভোগের জন্ম দিয়েছে।
নতুন প্রতিবেদনে কী আছে?
এক বছর ছয় মাস তদন্তের পর ৯৪ পৃষ্ঠার যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বলা হয়:
- ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশুদের অবহেলায় ফেলে যাওয়ার প্রবণতা ছিল উদ্বেগজনক।
- পরিবেশ ধ্বংসের বহু ঘটনা ঘটেছে—যেমন ২০২১ সালে ললডাইগা সংরক্ষণ এলাকায় বিশাল অগ্নিকাণ্ডে ১২ হাজার একর প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়।
- বিস্ফোরক ব্যবহারে অবহেলার কারণে বহু সাধারণ মানুষ মারা গেছে বা আহত হয়েছে।
- স্থানীয় শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য করা হলেও সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি।
- ব্রিটিশ সেনারা তদন্তে সহযোগিতা পর্যন্ত করেনি।
আরো যেসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে
শুনানিতে অনেক মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, কীভাবে ব্রিটিশ সেনারা তাদের মেয়েদের জীবন ধ্বংস করেছে। কেউ সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে বিদেশে ফিরে গেছে, কেউ দুর্ঘটনায় পঙ্গু করে রেখে গেছে।
২০২১ সালের দাবানলের পর বন্যপ্রাণী পালিয়ে কৃষিজমি নষ্ট করেছে, ধোঁয়ায় মানুষের চোখ-ফুসফুস জ্বলেছে—এমন বেদনাদায়ক বর্ণনা ভেসে ওঠে গ্রামবাসীদের মুখে।
অ্যাগনেস ওয়ানজিরুর গল্প
২০১২ সালে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর দুই মাস পর একটি সেপটিক ট্যাঙ্কে পাওয়া যায় তার লাশ—নগ্ন, ক্ষত-বিক্ষত, নির্মমভাবে হত্যা করা। সেই সময় ব্রিটিশ সেনারা ইতিমধ্যেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে।
বছরের পর বছর ন্যায়বিচারের অপেক্ষার পর ২০২৫ সালে অবশেষে একজন ব্রিটিশ নাগরিক রবার্ট পার্কিসকে গ্রেফতার করে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ। আদালতে অভিযোগ ওঠে—‘ভুল পথে যাওয়া যৌন সম্পর্ক’–এর অজুহাতে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। পার্কিস অভিযোগ অস্বীকার করলেও তার বিরুদ্ধে মামলার পরবর্তী শুনানি শিগগির শুরু হতে যাচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ হাই কমিশন বলেছে—তাদের বক্তব্য সংসদীয় প্রতিবেদনে বিবেচনা করা হয়নি। তবে প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে তারা।
এখন কী হবে?
প্রতিবেদনটি সুপারিশ করেছে—
- পার্কিসকে দ্রুত কেনিয়ায় বিচারের মুখোমুখি করা।
- অন্যান্য মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত।
- ব্রিটিশ সেনাদের রেখে যাওয়া শিশুদের দায়িত্ব নির্ধারণ।
- নির্যাতিত নারীদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও মানসিক সহায়তা।
- দেশে অবস্থানরত সব বিদেশি সেনাদের জন্য কঠোর আচরণবিধি প্রণয়ন।
অধিকারকর্মীরা বলছেন—এটি উপনিবেশিক ইতিহাসের ক্ষত সারানোর পথে এক ছোট কিন্তু সাহসী পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন বিদেশি শক্তির ভয়ে চোখ বন্ধ করে থাকা কেনিয়া এবার নিজের জনগণের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
তাদের আশা—এই বিচার শুধু কেনিয়ার নয়, গোটা আফ্রিকার জন্য নতুন এক উদাহরণ হয়ে উঠবে।
















