যুক্তরাজ্যের জাতীয় গণমাধ্যম বিবিসি আজ যে গভীর সংকটে নিমজ্জিত, তার শিকড় বহু বছরের পুরোনো। প্যানোরামা অনুষ্ঠানে ২০২১ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ভাষণ সম্পাদনা নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র সমালোচনা, এরপর মহাপরিচালক টিম ডেভি ও সংবাদপ্রধান ডেবোরা টারনেসের পদত্যাগ—সবই যেন বিস্ফোরণের শেষ ধাপ। কিন্তু আগুনটি জ্বলে উঠেছিল অনেক আগে। আর সেই আগুনের পেছনে ছিল এক অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী হাত—রবি গিব।
গিবের নাম দীর্ঘদিন ধরে শুধু রাজনীতি ও গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ মহলে ঘুরে বেড়াতো। এখন তা খোলামেলাভাবে আলোচিত, নিন্দিত আর বিতর্কের কেন্দ্রে। বিবিসি ও ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যবর্তী পথ ধরে তিনি বছরের পর বছর যাতায়াত করেছেন—কখনো বিবিসির ওয়েস্টমিনস্টার টিমের প্রধান, কখনো ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের প্রেস প্রধান, আবার কখনো বিবিসি বোর্ডের প্রভাবশালী সদস্য। তাঁর এই পথচলা একটিই লক্ষ্য নিয়ে—নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করা, এবং সেই প্রয়াসে বিবিসির নিরপেক্ষতার মূলকাঠামোকে নড়বড়ে করে তোলা।
লেখক ও প্রাক্তন চ্যানেল ৪ নিউজ সম্পাদক বেন ডে পিয়ার জানান, গিবের প্রভাব তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ২০১৭ সালে গিব যখন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন, তখনই শুরু হয় সংবাদ নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস। চ্যানেল ৪ নিউজকে মন্ত্রীদের সাক্ষাৎকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, অথচ বিবিসি সহজেই সেই সুযোগ পেত। ব্রেক্সিট নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা, উইন্ডরাশ স্ক্যান্ডালের প্রতিবেদন—যা-ই বিবিসির জন্য অস্বস্তিকর, গিব ছিলেন সেসবের ছায়া-পরিচালক।
চ্যানেল ৪ নিউজ যখন উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন শুরু করে, গিব রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর দলীয় সম্মেলনে চ্যানেল ৪ নিউজকে নিষিদ্ধ করে তিনি জানান দেন—ক্ষমতার কেন্দ্রে যে তিনি সবার উপরে, তা শুধু সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নয়, সংবাদ মাধ্যমের পথচলাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
২০১৯ সালে, থেরেসা মে’র বিদায়ের পর গিবকে বিবিসি বোর্ডে নিয়োগ করেন বরিস জনসন। এই পদটি আদতে সম্পাদনা বিভাগ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার জন্যই ছিল, কিন্তু গিব সেই সীমারেখা বহুবার অতিক্রম করেছেন বলে অভিযোগ করে বহু সাংবাদিক। সম্পাদক নিয়োগে হস্তক্ষেপ, সংবাদকর্মীদের ওপর চাপ, এমনকি বিবিসির ইসরায়েল–ফিলিস্তিন কাভারেজ নিয়ে প্রভাব বিস্তার—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন এক নীরব অথচ তীব্র উপস্থিতি।
বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের সময় তাঁর প্রভাব প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের বিধ্বংসী আগ্রাসন নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনগুলোতে নানান চাপের অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসক হত্যার তদন্তমূলক প্রামাণ্যচিত্র প্রচার না করা, বারবার দেরি করা, পরে তা সীমিত করে দেওয়া—সবই গিবের নির্দেশে হচ্ছে বলে বহু সূত্র জানায়। অবশেষে চ্যানেল ৪ প্রামাণ্যচিত্রটি প্রচার করে, বিবিসি নয়।
এভাবে বছর বছর চলে আসা অভ্যন্তরীণ চাপ ও রাজনৈতিক প্রভাব শেষমেশ বিবিসির নেতৃত্বকে নাড়িয়ে দেয়। ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর ভিডিও সম্পাদনা–বিতর্ক যেন শেষ আঘাত। গভীর ক্ষত নিয়ে ভেঙে পড়ে বিবিসির বিশ্বাসযোগ্যতা, এবং সামনে হাজির হয় সম্ভাব্য বিলিয়ন ডলারের মামলা।
রবি গিব হয়তো নিজেকে ভাবতেন বিবিসির নিরপেক্ষতার রক্ষক হিসেবে, কিন্তু তাঁর হাতে গড়া পথই আজ প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে এসেছে এক অভূতপূর্ব সংকটে। বহু বছরের ছায়া-খেলা, নীরব প্রভাব ও রাজনৈতিক আনুগত্য মিলিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এমন এক বাস্তবতা—যেখানে বিবিসি আর জনমানুষের কণ্ঠ নয়, বরং ক্ষমতার করিডরের প্রতিধ্বনি।
এই অন্ধকার অধ্যায়ের শেষে একটাই কথা স্পষ্ট: একটি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা যখন এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বদলে যেতে থাকে, তখন তা কেবল প্রতিষ্ঠানের নয়—সমগ্র সমাজের জন্যই এক দুঃখজনক পরিণতি।
















