নির্বাচন দায়িত্বে সেনাবাহিনীকে চাপানো “ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত”, বাড়ছে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার আশঙ্কা
এক সাক্ষাৎকারে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার দাবি করেছেন—নির্বাচন দায়িত্ব সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে ড. ইউনূস তাদের ভয়াবহ ঝুঁকিতে ফেলেছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক সম্ভাব্য সংঘর্ষ, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা, র্যাবের বিতর্ক এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে তাঁর কঠোর সমালোচনা।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেনাবাহিনীকে “জটিল ও মারাত্মক বিপদের মুখে ফেলেছেন”—এমন তীব্র সমালোচনা করেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। সম্প্রতি একটি বেসরকারি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর ওপর চাপানো সিদ্ধান্ত দেশকে নতুন অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
“সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের পর পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ”
ফরহাদ মজহারের ভাষ্য, পাঁচ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক পুনর্গঠন; কিন্তু বাস্তবতা উল্টো দিকে গেছে।
তিনি মন্তব্য করেন, “আমরা বহুবার বলেছি—আট তারিখের পরে দেশে এক সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব হয়েছে। দেশের পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হয়েছে।”
সেনাবাহিনীকে ‘গুলি করার দায়ে’ ঠেলে দেওয়া হচ্ছে
নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্তকে তিনি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে অভিহিত করেন।
তার কথায়—
“যদি কোনো এলাকায় হট্টগোল হয়, সেনাবাহিনীকে বাধ্য হয়ে গুলি করতে হবে। সেই দায় সেনাবাহিনীর ওপরই পড়বে। সেনাবাহিনীকে আপনি বছরের পর বছর ক্যান্টনমেন্টের বাইরে রেখেছেন; এবার সরাসরি বেসামরিক দায়িত্ব চাপিয়ে ভয়াবহ ক্ষতি করছেন।”
তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ–প্রশাসনের সঙ্গে সরকারের যোগসূত্র দুর্বল হওয়ায় সেই ফাঁক পূরণে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্বকে বিপন্ন করছে।
র্যাবের ‘উৎপত্তি’ নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা
২০০২–২০০৩ সালে র্যাব গঠনের প্রসঙ্গ টেনে ফরহাদ মজহার বলেন, বিএনপি সরকারের সময় সেনাবাহিনীকে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণে এনে “এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং”-এর সংস্কৃতি সৃষ্টি করা হয়, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও বহন করছে বাহিনী।
তার মতে,
“র্যাব শুরু থেকেই ছিল রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিচ্ছবি। সেই মানসিকতা নিয়ে যখন কিছু অফিসার বাহিনীতে ফেরত গেছেন, তখন তারা নিজের ভেতরেই ‘আয়নাঘর’ তৈরি করেছেন।”
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ‘কোন্দল’ বাড়ার আশঙ্কা
ফরহাদ মজহার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারকে ব্যক্তিগতভাবে “সমর্থন” জানালেও বলেন—মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম–খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত সেনা সদস্যদের বেসামরিক আদালতে বিচার না করে সেনা আইনে বিচার না করায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন—
“এর ফলে সেনাবাহিনীর ভেতরে নতুন করে কোন্দল তৈরি হয়েছে। ছোট একটি দেশের ছোট সেনাবাহিনী—তাদের এমন পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।”
“দশ বছর ধরে আপিল ঝুলে থাকবে”
সাম্প্রতিক মানবতাবিরোধী অভিযোগের রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেসামরিক আদালতে দেওয়া এসব রায় দীর্ঘ আপিল প্রক্রিয়ায় ঝুলে থাকবে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট আরও গভীর হবে।
ফরহাদ মজহারের মন্তব্যে পরিষ্কার যে তিনি সেনাবাহিনীর ওপর বর্তমান নির্বাচন–কেন্দ্রিক চাপকে দেশের নিরাপত্তা, স্থিতি ও পেশাদারিত্বের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন।
















