ইস্তাম্বুল, তুরস্ক – রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য তুরস্ককে বেছে নিয়েছেন পোপ লিও চতুর্দশ। এই প্রতীকী সিদ্ধান্তটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে যেন এক নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছে—যেখানে আছে সম্মান, দৃশ্যমানতা ও দীর্ঘদিনের ক্ষত সারানোর সম্ভাবনা।
এ সপ্তাহের সফরে পোপ রাষ্ট্রপতি রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। খ্রিস্টধর্মের প্রাচীন শিকড় যার মাটিতে গাঁথা, সেই দেশেই পরস্পর জড়িয়ে আছে ইসলামিক ঐতিহ্য ও ভিন্ন ধর্মের স্মৃতি।
৮০ মিলিয়নের অধিক জনসংখ্যার তুরস্ক আজ প্রায় সম্পূর্ণ মুসলিম-অধ্যুষিত। তবু এখানেই রয়ে গেছে শতাব্দীপ্রাচীন গ্রিক, আর্মেনীয়, সিরিয়াক এবং ল্যাটিন খ্রিস্টান সম্প্রদায়, যারা বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়েও দেশের সাংস্কৃতিক বুনোটে নিজেদের স্থান ধরে রেখেছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনা, জনসংখ্যা পরিবর্তন ও সম্পত্তি সংকটের দশক পেরিয়ে সংখ্যালঘু ফাউন্ডেশন প্রতিনিধিরা বলছেন—এখন তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছেন। পোপের সফর সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
গ্রিক ফাউন্ডেশনস অ্যাসোসিয়েশনের মানোলিস কোস্তিদিস বলেন, “এটা শুধু তুরস্কের জন্য নয়, আমাদের জন্যও এক বিরাট মর্যাদা। ইস্তাম্বুল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল, আর আজ এমন এক অতিথিকে স্বাগত জানানো আমাদের পরিচিতিকে আরও দৃঢ় করে।”
একসময়ের বৃহৎ সম্প্রদায়, আজ ছোট্ট আলোর দলে
তুরস্কের প্রতিষ্ঠাকালীন দশকে গ্রিক, আর্মেনীয় ও সিরিয়াক জনসংখ্যা ছিল কয়েক লক্ষ। ১৯৪২ সালের সম্পদকর, ১৯৫৫ সালের ইস্তাম্বুল পোগ্রম, ১৯৬৪ সালের গণ-নির্বাসন—ইতিহাসের বহু আঘাত তাদের ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বজুড়ে। আজ এরা নেই আগের মতো সংখ্যায়, কিন্তু আছে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, অটুট টিকে থাকার গল্প।
সংখ্যালঘু ফাউন্ডেশন প্রতিনিধি কার্যালয়ের প্রধান জান উস্তাবাছি বলেন, “আমরা জনসংখ্যার হাজারে একজন। ইতিহাস আমাদের এখানে এনেছে—তবু আমরা এই দেশেরই নাগরিক।”
২০০৩ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন–চালিত সংস্কারগুলো সংখ্যালঘু ফাউন্ডেশনগুলোর সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায় খুলে দেয়। ২০১১ সালে সরকারের নির্দেশে বহু জমি ও ভবন ফেরত দেওয়া হয়—বিতর্কের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে।
উস্তাবাছি বলেন, “এরদোয়ানের নির্দেশ ছিল—যা তাদের ন্যায্য অধিকার, তা ফেরত দাও। আগে একটা গির্জা রং করতেও বছরের পর বছর লাগতো। এখন দরজাই খুলে যায় সহজে।”
আরও নিরাপত্তা, আরও সাহস
এই বদলে যাওয়া পরিবেশ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন সিরিয়াকরা, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের ঐতিহাসিক তুর আবদিন অঞ্চলে। সেখানে প্রবাসে থাকা বহু পরিবার বাড়ি নির্মাণ শুরু করেছে নতুন করে। উন্নত রাস্তা, স্থিতিশীল নিরাপত্তা—সবই তাদের ফিরিয়ে আনছে শেকড়ের টানে।
উস্তাবাছির ভাষায়, “সন্ত্রাসহীন তুরস্ক মানুষের মনে সাহস জাগায়।”
এদিকে কেউ কেউ চান ইস্তাম্বুলেও প্রত্যাবর্তনের পথ। কোস্তিদিসের মতে, “বাসস্থান সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হলে অনেকেই ফিরতে চাইবেন। ইস্তাম্বুলের শক্তি তার বহুত্বে—মুসলিম, ইহুদি, আর্মেনীয়, সিরিয়াক, গ্রিক—সবাই মিলে এই শহরের আত্মা।”
আইনি জটিলতা এখনও রয়ে গেছে
সংখ্যালঘুদের বোর্ড নির্বাচন, সম্পত্তি হস্তান্তরসহ কিছু পুরোনো মামলার সমাধান হয়নি। আইনজীবী কেজবান হাতেমি বলেন, “আগের মানসিকতা পুরোপুরি বদলায়নি। তবে আশার আলো আছে।”
তুর্কি-আর্মেনীয় সাংবাদিক এতিয়েন মাহচুপিয়ান মনে করেন, ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক বিদ্রোহের পর রাষ্ট্রযন্ত্র আরও প্রভাবশালী হওয়ায় সংস্কারের গতি কমে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন—ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্যপদের আলোচনা পুনরুজ্জীবিত হলে পরিবর্তন আবার ফিরে আসতে পারে।
পোপের সফর নতুন বার্তা বহন করে
মাহচুপিয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্কের ভাবমূর্তি উন্নত করতে পোপের সফর গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ নিয়ে পোপের অবস্থান তুরস্কের নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যাওয়ায়।
“এ সফর সংখ্যালঘুদেরও মনে করিয়ে দিচ্ছে—তারা ভুলে যাওয়া নয়,” তিনি বলেন।
কোস্তিদিসের চোখে এটি আরও বড় প্রতীক—
“মুসলিম-প্রধান এক দেশ বিশ্বের খ্রিস্টান নেতাকে স্বাগত জানাচ্ছে। এর চেয়ে শক্তিশালী বার্তা আর কী হতে পারে?”
















