রুশভাষী জগতে সম্প্রতি অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয় উজবেকিস্তান জন্ম, রুশ ভাষায় লেখেন এমন ইসরায়েলি সাহিত্যিক দিনা রুবিনার এক সাক্ষাৎকার। নির্বাসিত অবস্থায় থাকা বিরোধী টেলিভিশন চ্যানেল রেইন টিভিতে দেওয়া দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি দাবি করেন, গাজায় কোনো নিরীহ মানুষ নেই, ইসরায়েলের অধিকার আছে পুরো অঞ্চলকে মুছে ফেলে একটি নির্জন পার্কিং লটে পরিণত করার, এমনকি ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকে অ্যাসিডে গলিয়ে ফেলার কথাও বলেন তিনি।
যিনি সাক্ষাৎকার নেন, সেই সাংবাদিক মিখাইল কোজিরেভ কথাগুলোকে “জটিল অংশ” বলে আলাদা করে বাদ দিলেও, তার নিজস্ব অবস্থান ছিল স্পষ্টতই ইসরায়েলের পক্ষে। তুলনা টানলেও তিনি রুবিনার ঘৃণামূলক মন্তব্য সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেননি।
রুবিনার এই উক্তি বিশাল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে তার অনুষ্ঠান বাতিল হয়। কিন্তু নির্বাসিত রুশ রাজনৈতিক মহলের অনেকেই তাকে সমর্থন করেন, কেউ নীরব থাকেন, আর কেউ বলেন তার কথাগুলো ভুলভাবে ছড়ানো হয়েছে।
এ দৃশ্য কোনো ব্যতিক্রম নয়। রাশিয়ার উদারপন্থী বিরোধী মহলের একটি বড় অংশ, যারা আজ মূলত বিদেশে ছড়িয়ে আছে, নিঃশর্তভাবে ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়ায়। দেশের ভিতরের বৈষম্য ও বর্ণবাদকে তারা যেমন উপেক্ষা করে আসে, তেমনই পশ্চিমের শ্বেতকেন্দ্রিক সভ্যতা-হায়ারার্কি ধারণাকে তারা চোখে-মনে স্থান দিয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি স্বভাবতই ফিলিস্তিনবিরোধী অবস্থানের জন্ম দেয়।
এর বহু উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। নির্বাসিত কলামিস্ট ইউলিয়া লাতিনিনা সভ্যতা আর বর্বরতার তুলনায় ফিলিস্তিনিদের ঠাঁই দেন অন্ধকার কোণে, গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদী ছাত্রদের বলেন আলসে আর বোকা। অন্যদিকে বিশ্লেষক লিওনিদ গজমান দাবি করেন, ইউরোপের দেশগুলো জাতিসংঘে গাজার অস্ত্রবিরতির পক্ষে ভোট দিয়েছে তাদের অভিবাসী সম্প্রদায়কে ভয় পেয়ে।
ওপেন রাশিয়ার সাবেক পরিচালক আন্দ্রেই পিভোভারভ মনে করেন গাজায় ইসরায়েলের অভিযান ন্যায়সঙ্গত। বুলগেরিয়ায় থাকা আরেক রাজনৈতিক নির্বাসিত দিমিত্রি গুদক বলেন, তার চোখে ইসরায়েল সভ্যতার প্রতীক, আর এর বিরুদ্ধে যা দাঁড়ায় তা বর্বরতা।
রুশ ভাষার জনপ্রিয় সাংবাদিক ক্সেনিয়া লারিনার অনুষ্ঠানেও বহুবার ইসরায়েলি রুশ ভাষী বুদ্ধিজীবীরা হাজির হন, আর আলোচনায় উঠে আসে ফিলিস্তিন স্বীকৃতিকে উপহাস করার শিরোনাম।
এমন অবস্থানের প্রতিধ্বনি শোনা যায় বিপুল রুশভাষী জনতার ভেতর। তাদের অনেকেই বিনোদন জগত থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে অবস্থান নিয়ে গাজার ধ্বংসযজ্ঞের পক্ষে প্রচারণা চালান। নোবেলজয়ী নোভায়া গাজেটা, জনপ্রিয় মিডিয়া মেদুজা, রেইন টিভি—সবই প্রাধান্য দেয় ইসরায়েলের বিবৃতিকে, প্রায় অনুপস্থিত থাকে পাল্টা মত।
এই পক্ষপাতের শিকড় ছড়িয়ে আছে বিংশ শতকের ইতিহাসে। তৎকালীন রুশ সাম্রাজ্যে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন এবং পরে সোভিয়েত যুগে স্ট্যালিনের অধীনে দ্বিতীয় ঢেউয়ের বৈষম্য উদারপন্থীদের মধ্যে ইসরায়েলকে নিরাপত্তার স্থান ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলে। পরবর্তীকালে অনেক ভিন্নমতের সোভিয়েত নাগরিকের জন্য ইসরায়েল হয়ে ওঠে আশ্রয়।
তারপর ২০২২ সালের আগ্রাসন। ইউক্রেনযুদ্ধের পরে লাখ লাখ বিরোধী রুশ যখন দেশ ছাড়ে, তখন ইসরায়েল তাদের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়। ২০২২ সালেই প্রায় ৭০ হাজার রুশ নাগরিক সেখানে যায়। ক্রমে এক বিশাল রুশভাষী ইসরায়েলি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে।
বিরোধীরা নিজেদের নৈতিক, গণতান্ত্রিক বিকল্প বলে উপস্থাপন করলেও, তাদের বক্তব্যে বারবার প্রকাশ পায় ফিলিস্তিনবিরোধী বর্ণবাদ। তারা ইউক্রেনে রুশ আক্রমণকে নিষ্ঠুর হিসেবে নিন্দা করে, কিন্তু ইসরায়েলের বোমাবর্ষণকে নীরবে পাশ কাটিয়ে যায়।
আরো বিস্ময়কর হলো, এদের অনেকেই রাশিয়ার ভেতরে অন্য জাতিগোষ্ঠী, মুসলিম, অভিবাসী বা আদিবাসীদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মনোভাব প্রকাশ করে এসেছে। আলেক্সেই নাভালনির অতীত মন্তব্য যেমন অভিবাসীদের পোকামাকড়ের সঙ্গে তুলনা করেছে, তেমনি কারা মুরজার সাম্প্রতিক মন্তব্যে সংখ্যালঘু সৈন্যদের অমানবিক আচরণের অভিযোগ উঠে এসেছে।
অত্যাচার যখন হয় সংখ্যালঘুদের ওপর, তখন এ বিরোধীরা নীরব থাকে। কিন্তু যখন তাদের কোনো পরিচিত ব্যক্তিত্ব মারা যায়, তখন শোকোচ্ছ্বাসে আকাশ ভরে ওঠে। এ দ্বৈতবোধের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের নৈতিকতার ফাঁকফোকর।
তারা দাবি করে যে পুতিনের পতনের পর তারা এনে দেবে এক নতুন রাশিয়া। অথচ ফিলিস্তিনের প্রশ্নে তাদের অবস্থান উলঙ্গ করে দেয় সেই ভেতরের না বলা সত্যকে। যে সত্য হলো, ক্ষমতার রাজনীতি যতটা না বদলায়, ততটাই অটুট থাকে অভ্যন্তরীণ বৈষম্যের উত্তরাধিকার।
আজ প্যালেস্টাইনের ওপর যে অমানবিকতা নেমে আসে, দখল আর অপমানের যে দীর্ঘ ছায়া চলে, তা রাশিয়ার বহু জাতিগত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাসকেও প্রতিধ্বনিত করে। কিন্তু রুশ উদার বিরোধীদের চোখ সেই যন্ত্রণাকে দেখে না। তারা নিজেদেরই কেবল বেদনার কেন্দ্র ভাবতে চায়।















