স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে সংযোগ বাড়াতে পারে, তবে এর বিনিময়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হলে তা ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। আগামী বছর থেকে সেখানে এ সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে এমন অনেক এলাকায় ইন্টারনেট পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে, যেখানে প্রচলিত তারযুক্ত বা মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন ব্যয়বহুল ও কঠিন।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বিস্তার আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে। তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—ইন্টারনেট সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি এসব দেশের অর্থনীতি, তথ্য ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কি বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?
ইন্টারনেট এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং, ব্যবসা, সরকারি সেবা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—সবকিছুর সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে নেটওয়ার্ক পরিচালনার ক্ষমতা থাকলে সে প্রতিষ্ঠান কোন এলাকায় সেবা দেবে, কত খরচ নেবে এবং কোন শর্তে সেবা দেবে—এসব সিদ্ধান্তেও তার প্রভাব তৈরি হয়।
এখানেই তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল নির্ভরতার ঝুঁকি। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তাদের স্যাটেলাইট, মেঘভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা, তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলে তা কেবল বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বিশ্বে এখনো প্রায় দুইশ বিশ কোটি মানুষ ইন্টারনেটের বাইরে। তাদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা। আফ্রিকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হারও তুলনামূলকভাবে কম, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। অনেক দরিদ্র দেশে স্থায়ী উচ্চগতির ইন্টারনেটের খরচ মানুষের মাসিক গড় আয়ের বড় অংশের সমান।
স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক দুর্গম এলাকায় সংযোগ দিতে পারে, কিন্তু এতে যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ ও তথ্য ব্যবহারের খরচের সমস্যা পুরোপুরি দূর হয় না। কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান যখন এসব সেবার মূল্য নির্ধারণ করে, তখন সাধারণ মানুষের যোগাযোগের সুযোগের ওপরও তার প্রভাব তৈরি হয়।
আফ্রিকার ইতিহাসে এমন নির্ভরতার পুরোনো নজির রয়েছে। ঔপনিবেশিক যুগে অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয় সম্পদ বিদেশে নিয়ে যাওয়া হতো। বর্তমান সময়ে একই ধরনের কাঠামো সরাসরি পুনরাবৃত্তি না হলেও ডিজিটাল অবকাঠামোর মালিকানা, তথ্য ও মুনাফার নিয়ন্ত্রণ যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তাহলে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক নির্ভরতা তৈরি হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগভিত্তিক বিনামূল্যের ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রেও এমন বিতর্ক দেখা গেছে। ভারতে দরিদ্র মানুষের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসেবা বিনা খরচে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সমালোচকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, এতে ব্যবহারকারীদের কাছে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত সেবাই পুরো ইন্টারনেটের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরে তথ্যভিত্তিক মূল্য বৈষম্য বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ব্যবহারকারীদের কোন তথ্য পড়া, দেখা বা ব্যবহার করা উচিত—এ বিষয়ে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একতরফা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সীমিত হয়।
এখন ঝুঁকিটি আরও বড় হয়ে উঠতে পারে। কারণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়, সমুদ্রতলবর্তী যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট, তথ্য সংরক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—ডিজিটাল অবকাঠামোর একাধিক স্তরে প্রবেশ করছে।
কোনো একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি একই সঙ্গে সংযোগ, তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবা নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে একই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। স্থানীয় ব্যবহারকারী ও বাজার তৈরি করলেও মালিকানা, মুনাফা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত বিদেশেই থেকে যেতে পারে।
তবে কিছু দেশ বিকল্প পথও দেখিয়েছে। ব্রাজিলের নিজস্ব উপগ্রহভিত্তিক অবকাঠামো হাজার হাজার সরকারি স্থাপনা, গ্রামীণ বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংযোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশি সেবাদাতাকে সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে না দাঁড় করিয়ে সরকারি অবকাঠামোর পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা দেখা যায়।
নামিবিয়াও বিদেশি মালিকানাধীন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় মালিকানার শর্তকে গুরুত্ব দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায়ও বিদেশি সেবাদাতার স্থানীয় অংশীদারের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্থানীয় অংশীদার থাকা আর মূল প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর ওপর স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ থাকা এক বিষয় নয়।
ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া বা না দেওয়াই যথেষ্ট নয়। ইন্টারনেটের ন্যায্য মূল্য, সর্বজনীন সেবা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ, আন্তদেশীয় তথ্য স্থানান্তর, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্থানীয় মালিকানার বিষয়ে শক্তিশালী নীতি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠান যেন ইচ্ছামতো মানুষের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনের সময়, বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক সংকটে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা বিভিন্ন দেশে ঘটেছে। তাই ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের অর্থ শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ঠেকানো নয়; জনগণের অধিকারও সুরক্ষিত রাখা।
আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেও এই নির্ভরতা কমানো সম্ভব। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলো যৌথভাবে স্যাটেলাইট ব্যবস্থাপনা, তথ্যকেন্দ্র, যোগাযোগ অবকাঠামো ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করতে পারে। আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোও এসব প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারে।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট গ্লোবাল সাউথের কোটি কোটি মানুষকে সংযুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য যেন নতুন ধরনের নির্ভরতা সৃষ্টি না করে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ডিজিটাল ভবিষ্যৎ এমন হতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি জনগণের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াবে—বিদেশি করপোরেশনের হাতে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করবে না।















