চীন বাণিজ্যিক সংযোজনভিত্তিক পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। দেশটির বিজ্ঞানীরা নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি অতিপরিবাহী চৌম্বক সফলভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। এই সাফল্যকে চীনের বহুল আলোচিত ‘কৃত্রিম সূর্য’ কর্মসূচির অন্যতম বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্জন ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি উৎপাদনের পথকে আরও সুদৃঢ় করবে।
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভাজনভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এতে ভারী মৌলের পরমাণু বিভক্ত করে শক্তি উৎপন্ন করা হলেও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে সংযোজনভিত্তিক পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে হালকা মৌলের পরমাণু অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মধ্যে একত্রিত হয়ে শক্তি সৃষ্টি করে। সূর্যের ভেতর একই প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন হয়। এই প্রযুক্তিতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের পরিমাণও অত্যন্ত কম। যদিও প্রযুক্তিটি এখনও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে, তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সংযোজন শক্তি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গেলেও চীন ধারাবাহিক বিনিয়োগ, উন্নত অতিপরিবাহী প্রযুক্তি, শক্তিশালী চৌম্বক ব্যবস্থা এবং অতি উত্তপ্ত প্লাজমা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি জোরদার হচ্ছে।
দক্ষিণ ইউরোপের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পে বিশ্বের একাধিক দেশের সঙ্গে চীনও অংশগ্রহণ করছে। একই সঙ্গে নিজস্ব গবেষণা কর্মসূচির আওতায় দেশটি বহু বছর ধরে সংযোজন প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করে আসছে।
সম্প্রতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া দুটি অতিপরিবাহী চৌম্বক অতি উত্তপ্ত প্লাজমাকে নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্লাজমার তাপমাত্রা সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রারও বহু গুণ বেশি হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণ করাই সংযোজন শক্তি উৎপাদনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রযুক্তি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বলয়াকৃতির অতিপরিবাহী চৌম্বকও তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ তাপমাত্রায় কার্যকর কেন্দ্রীয় অতিপরিবাহী কুণ্ডলীর পরীক্ষাও সফল হয়েছে। কয়েক বছরের গবেষণার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে একাধিক উদ্ভাবনী অধিকারও অর্জিত হয়েছে।
চীনের লক্ষ্য আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র সংযোজন পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা সম্পন্ন করা এবং পরবর্তী সময়ে সংযোজনভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জনের কৌশলগত পদক্ষেপও।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংযোজনভিত্তিক শক্তি প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে বাস্তবায়নের আগে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান, নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত একচেটিয়াকরণ, সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এড়িয়ে মানবকল্যাণে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
















