মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত ভারতের বহুমুখী কূটনৈতিক নীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি বর্তমান সংকটে বাস্তব পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
ভারতের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপ, রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি নিয়ে নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং ইরান ইস্যুতে সতর্ক অবস্থান ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইসরায়েল ও ইরানের সঙ্গে ভারতের পৃথক কৌশলগত সম্পর্ক এখন নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন তৈরি করেছে।
ভারতের জন্য ইরান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চাবাহার বন্দর হয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বিকল্প পথ এটি। অন্যদিকে ইসরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সহযোগী এবং যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের প্রধান কৌশলগত অংশীদার। ফলে যেকোনো এক পক্ষের প্রতি প্রকাশ্য ঝুঁকে পড়া ভারতের অন্যান্য সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
সাম্প্রতিক ব্রিকস বৈঠকেও এই ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানাতে চাইলেও অন্য কয়েকটি দেশ ভিন্ন অবস্থান নেয়। ভারত সংঘাতের বদলে সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন এবং সমুদ্রপথে নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে। তবে মতপার্থক্যের কারণে বৈঠকটি যৌথ ঘোষণা ছাড়াই শেষ হয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুদ্ধ ভারতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারতের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি হয়। অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস এবং কৃষিতে ব্যবহৃত সার আমদানির বড় অংশ এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করায় ভারতের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
ভারত বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করলেও বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা এখনো কমানো সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট প্রমাণ করছে যে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার সময়ে কার্যকর হলেও সরাসরি সামরিক সংঘাতে সেই ভারসাম্য ধরে রাখা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তাই ভারতের বহুমুখী কূটনীতির সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
















