তীব্র ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি হারানো আফগান জনগণ এখন সংগ্রাম করছে আশ্রয়হীন জীবনের বিরুদ্ধে। উত্তরের সামাঙ্গান ও বালখ প্রদেশে ঘটে যাওয়া ৬ দশমিক ৩ মাত্রার এই ভূমিকম্পে অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, জানিয়েছে তালেবান প্রশাসন। কিন্তু মৃতের সংখ্যা নয়, জীবিতদের আর্তনাদই আজ আফগান মাটির বুকে সবচেয়ে করুণ সুর তোলে।
সামাঙ্গানের খুলম জেলায় ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলে বসবাসকারী গুলাবউদ্দিন হারিয়েছেন তাঁর পুত্রবধূকে। নিজে মাথায় আঘাত পেয়েছেন ভেঙে পড়া ছাদের নিচে। তাঁর কণ্ঠে হাহাকার— “সব হারিয়ে ফেলেছি। শীত আসছে। চার-পাঁচ বছরের বাচ্চারা আছে। কোথায় যাব আমরা?”
বৃষ্টিতে কাদা হয়ে গেছে ভাঙা বাড়ির উঠোন, ছিন্ন ছাদের নিচে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে। যেন প্রকৃতি নিজেও কাঁদছে আফগানদের সাথে। এর আগে আগস্ট মাসে পূর্ব আফগানিস্তানে আরও ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল— দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ট্র্যাজেডি।
কুনার প্রদেশের পাহাড়ি গ্রাম মাজার দারার বাজারগা সাফাই সেই প্রথম ভূমিকম্পে হারিয়েছেন দুই আত্মীয়কে। এখন তিনি ১৫ জনের সাথে একটি ছেঁড়া তাঁবু ভাগ করে নিচ্ছেন, যেখানে ১২ জন শিশু শীতের কামড়ে কাঁপছে। “আমরা একটি তাঁবু পেয়েছি, কিন্তু এটি শীতের জন্য উপযুক্ত নয়,” বলেন সাফাই।
ভয় এখনও কাটেনি। ঘরগুলো ফেটে গেছে, দেয়ালগুলো হেলে আছে— তাই গ্রামবাসীরা সাহস পাচ্ছে না ঘরে ফিরতে। রাত কাটাচ্ছে খোলা আকাশের নিচে, তাপমাত্রা নামছে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, অথচ শরীরে নেই গরম পোশাক বা কম্বল।
তালেবান প্রশাসনের তথ্য কর্মকর্তা নাজিবুল্লাহ হানাফি বললেন, “ভূমিকম্প যখন হয়েছিল, তখন ছিল গ্রীষ্মকাল। তখনকার সহায়তা ছিল মৌসুমি প্রয়োজন অনুযায়ী। এখন শীত এসে গেছে, তারা উষ্ণ পোশাক আর আশ্রয়ের জন্য মরিয়া।”
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, বড় দাতারা— বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র— তহবিল কমিয়ে নেওয়ায় ত্রাণ কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। মাজার দারার পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি করা হয়েছে কিছু শিবির, কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানায়, প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ সেখানেই থেকে যাচ্ছে— কারণ কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য নেই।
অনেকে বলছেন, এখন একমাত্র আশাই হলো নতুন করে ঘর গড়া— শক্ত মাটিতে, কংক্রিট আর ইটের বাঁধনে। ২৭ বছর বয়সী কৃষক সাইয়িদ ওয়ালি সাফাই বলেন, “আমাদের ঠিকভাবে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। কেবল মাটির ঘর নয়, এবার কংক্রিট দিয়েই ঘর তুলতে হবে।”
অন্য এক বাসিন্দা আওয়াল জানের কণ্ঠে দৃঢ়তা, “আমরা একই জায়গায় আবার ঘর তুলব, কিন্তু একইভাবে নয়। যদি আবার বাঁচতে চাই, আমাদের ঘরও শক্ত হতে হবে।”
ভূমিকম্প শুধু ঘর নয়, ভেঙে দিয়েছে মাজার-ই-শরিফের ঐতিহাসিক নীল মসজিদের দেয়ালও— আফগানিস্তানের অন্যতম পবিত্র নিদর্শন। ভাঙা দোকান, ছিন্ন পথ, ধ্বংসস্তূপে বসে থাকা মানুষ— সবকিছুই যেন সাক্ষী দিচ্ছে এক জাতির নীরব কান্নার।
উত্তরের পাহাড়ের কোলে, কুয়াশা আর ঠান্ডার আঘাতে, আফগান জনগণ আজ প্রশ্ন করছে আকাশের দিকে— “আর কতটা সহ্য করতে হবে?”
















