মার্কিন কংগ্রেসের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম নারী স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ঘোষণা করেছেন, তিনি আর পুনর্নির্বাচনে অংশ নেবেন না। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে পেলোসি জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে বর্তমান মেয়াদ শেষে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেবেন।
৮৫ বছর বয়সী এই প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতা বৃহস্পতিবার নিজের শহর সান ফ্রান্সিসকোর মানুষদের উদ্দেশে এক আবেগঘন ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমি চাই, আমার প্রিয় সান ফ্রান্সিসকানরা প্রথম জানুক—আমি কংগ্রেসে আর প্রার্থী হচ্ছি না। কৃতজ্ঞ হৃদয়ে আমি শেষ বছরটি পার করব আপনাদের প্রতিনিধি হিসেবে।”
ন্যান্সি পেলোসি ১৯৮৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে কাজ করছেন। তিনি ছিলেন আধুনিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। দু’দফায় প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—২০০৭ থেকে ২০১১ এবং ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। তার নেতৃত্বে কংগ্রেসে পাস হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঐতিহাসিক ‘আফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে পেলোসি ছিলেন তার সবচেয়ে কঠিন সমালোচকদের একজন। ২০১৯ সালে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা ফিরে আসার পর পেলোসি ট্রাম্পের আইনসভা কার্যক্রম কার্যত স্থবির করে দেন। ২০২০ সালে ট্রাম্পের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ শেষে জনসম্মুখে তার বক্তব্যের কপি ছিঁড়ে ফেলেন পেলোসি—যা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে থেকে গেছে।
তার নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটরা জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় বিশাল অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ ও অবকাঠামো খাতে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বিল পাস করতে সক্ষম হয়। যদিও দলের ভেতরে প্রগতিশীল শাখার সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব একসময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পেলোসি তবু একতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছিলেন।
২০২২ সালে তার বাড়িতে এক ব্যক্তি হামলা চালিয়ে তার স্বামী পল পেলোসির মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন, এতে তার গুরুতর আঘাত লাগে। সেই সময় পেলোসি বাড়িতে ছিলেন না। এই ঘটনার পর তার নিরাপত্তা এবং পরিবারের জীবনে এক অন্ধকার ছায়া নেমে আসে।
অর্থনৈতিক নীতিতে তিনি ছিলেন ডেমোক্র্যাটদের মধ্যপন্থার প্রতীক। যদিও অনেক বামপন্থী তাকে অভিযুক্ত করেছেন যথেষ্ট প্রগতিশীল না হওয়ার কারণে, যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থীদের কাছে তিনি ছিলেন “উদার ব্যয়ের প্রতীক”।
বিদেশনীতি নিয়ে পেলোসি ছিলেন স্পষ্টভাষী—ইউক্রেনের দৃঢ় সমর্থক এবং চীনের তীব্র সমালোচক। ২০২২ সালে তিনি তাইওয়ান সফর করে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কে তীব্র সঙ্কট সৃষ্টি করেছিলেন। তবে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও, ইসরায়েলের প্রতি তার সমর্থন ছিল অবিচল। ২০১৮ সালে এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “এই ক্যাপিটল যদি ধসে পড়ে, তবুও আমাদের ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা অটুট থাকবে, কারণ এটি আমাদের অস্তিত্বেরই অংশ।”
কংগ্রেসে প্রায় চার দশক ধরে তিনি ছিলেন শক্তি, প্রজ্ঞা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। তাকে সম্মান জানিয়ে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, “ন্যান্সি পেলোসি একজন কিংবদন্তি, পথপ্রদর্শক এবং আমেরিকার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা স্পিকার। তিনি শিশুদের, জলবায়ুর, জাতির এবং জনগণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।”
ন্যান্সি পেলোসি আজ শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি এক অধ্যবসায়ী নারী যিনি প্রমাণ করেছেন—ক্ষমতা মানেই কণ্ঠরোধ নয়, বরং সাহসী অবস্থান নেওয়া। কংগ্রেসের করিডরে তার পদধ্বনি হয়তো শিগগিরই মিলিয়ে যাবে, কিন্তু তার উত্তরাধিকার রয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়, নারীর শক্তির এক অনন্ত প্রতীক হয়ে।
















