৯ মাসে আয় কমেছে ৫.৫ শতাংশ; খেলাপি ঋণের পাহাড় জমার আশঙ্কা উদ্যোক্তাদের
দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের ত্রিমুখী চাপে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এই দুই খাতের রফতানি আয় কমেছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। রফতানির এই নেতিবাচক ধারায় ব্যাংক খাতের বিনিয়োগ করা প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা এখন আদায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় পণ্য রফতানি সামগ্রিকভাবে ৪.৮৫ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে মার্চ মাসে রফতানি আয়ে ধস নেমেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ কম। এই মন্দার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের ব্যাংকগুলোতে, কারণ মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশই এই দুই খাতের।
সংকটের মূল কারণ ও বর্তমান চিত্র:
- ক্রয়াদেশে ভাটা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রেতারা নতুন অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন। অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকই এখন অলস পড়ে আছে।
- জ্বালানি সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দেশে ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত শিপমেন্ট ব্যাহত হচ্ছে।
- ঋণের বোঝা: ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাক ও বস্ত্র খাতে ঋণের স্থিতি ছিল ৩.৩৭ লাখ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৪ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্যাংক নির্বাহীদের মতে, অনেক বড় উদ্যোক্তাও এখন খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
- এলসি খোলার হার হ্রাস: আগামীতে রফতানি বাড়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ, কারণ কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার হার ১০.৬৯ শতাংশ কমে গেছে।
শীর্ষ উদ্যোক্তা ও ব্যাংকারদের উদ্বেগ: মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীরা মুনাফা করতে না পারলে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন না, যা খেলাপি ঋণের হারকে আরও উসকে দেবে। ইতিমধ্যে গত দেড় বছরে ২০০টির বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “অতীতে তৈরি পোশাক খাত এমন অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়নি।” বিটিএমএ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদেশি ক্রেতারা শিপমেন্ট পিছিয়ে দেওয়ায় উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ইপিবির তথ্য বলছে, শীর্ষ বাজারগুলোতেও বাংলাদেশের অবস্থান নড়বড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ১.১০ শতাংশ এবং জার্মানিতে ১৩.৫৪ শতাংশ রফতানি কমেছে। এই সংকট উত্তরণে সরকার যদি দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং বিশেষ নীতিসহায়তা প্রদান না করে, তবে দেশের ব্যাংক খাত এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
















