পানামা পেপারস ছিল বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বড় তথ্যফাঁস, যা ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ নথি ফাঁস হয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গোপন দিক উন্মোচিত করে।
এই নথিগুলো প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি জোট, যেখানে ৮০টিরও বেশি দেশের ৩৫০ জনের বেশি সাংবাদিক কাজ করেন। তথ্যগুলো আসে পানামাভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকা থেকে।
কি ছিল এই কেলেঙ্কারির মূল বিষয়
ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা অফশোর শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল অর্থ লুকিয়ে রাখতেন। এসব কোম্পানি মূলত কর ফাঁকি, সম্পদ গোপন রাখা বা আর্থিক লেনদেন আড়াল করার কাজে ব্যবহৃত হতো।
প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার কোম্পানির সঙ্গে ২০০টির বেশি দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক পাওয়া যায়। যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া—প্রায় সব বড় অর্থনীতির সঙ্গেই এর সংযোগ ছিল।
কারা জড়িত ছিলেন
এই ফাঁসে ১৪০ জনের বেশি রাজনীতিবিদের নাম উঠে আসে। তাদের মধ্যে ছিলেন আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মরিসিও মাক্রি, ইউক্রেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডুর গুনলগসন।
এর ফলে কিছু দেশে বড় রাজনৈতিক প্রভাব পড়ে। আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন, আর পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং পরবর্তীতে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ হন।
অফশোর শেল কোম্পানি কী
অফশোর কোম্পানি হলো এমন প্রতিষ্ঠান যা মালিকের নিজ দেশের বাইরে নিবন্ধিত হয়। শেল কোম্পানি সাধারণত বাস্তব কোনো ব্যবসা পরিচালনা করে না, বরং কাগুজে লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর বা গোপন রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়।
এগুলো সবসময় অবৈধ নয়, তবে বৈধ ও অবৈধ ব্যবহারের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
কতটা পরিবর্তন এসেছে
পানামা পেপারস প্রকাশের পর বিভিন্ন দেশ নতুন আইন ও নীতি প্রণয়ন করে। যুক্তরাষ্ট্রে করপোরেট স্বচ্ছতা আইন চালু হয়, যেখানে প্রকৃত মালিকদের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়।
২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি ডলার কর, জরিমানা ও অন্যান্য অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সুইডেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পুনরুদ্ধার করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, লুকানো সম্পদের তুলনায় এই উদ্ধারকৃত অর্থ খুবই সামান্য।
চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে
আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থায় এখনো বড় ফাঁকফোকর রয়েছে। কোনো একক বৈশ্বিক করনীতি না থাকায় ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন দেশের আইনের সুযোগ নিয়ে কর এড়াতে পারে।
এছাড়া বিভিন্ন দেশের মধ্যে করচুক্তির জটিলতা ও তথ্য আদান-প্রদানের সীমাবদ্ধতাও বড় সমস্যা।
সার্বিকভাবে, পানামা পেপারস বিশ্বজুড়ে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনার সূচনা করলেও, পুরোপুরি পরিবর্তন আনতে এখনো অনেক পথ বাকি।
















