সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এক নতুন প্রবণতা। অনেকেই এখন এমন পেপটাইড ইনজেকশন নিচ্ছেন, যেগুলোর বোতলে স্পষ্ট লেখা থাকে—মানবদেহে ব্যবহারের জন্য নয়। তবু ত্বক ভালো রাখা, পেশি বৃদ্ধি বা দ্রুত আঘাত সেরে ওঠার আশায় অনিয়ন্ত্রিত এসব পদার্থ শরীরে প্রবেশ করাচ্ছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে উদ্বেগজনক প্রবণতা বলে সতর্ক করছেন।
পেপটাইড হলো অ্যামিনো অ্যাসিডের ছোট শৃঙ্খল, যা মূলত ক্ষুদ্র প্রোটিন। মানবদেহ স্বাভাবিকভাবেই কিছু পেপটাইড তৈরি করে, যা কোষকে নির্দেশনা দেওয়া, হরমোন নিয়ন্ত্রণ, ত্বকের স্বাস্থ্য ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পেপটাইড ব্যবহার হচ্ছে। ইনসুলিন তার একটি উদাহরণ।
তবে সম্প্রতি ওজন কমানোর ওষুধ জনপ্রিয় হওয়ার পর সুস্থতা বাজারে অনিয়ন্ত্রিত পেপটাইডের বিস্তার বেড়েছে। এগুলোর অনেকই আইনি দিক থেকে সরাসরি অবৈধ নয়, কিন্তু মানবদেহে ব্যবহারের অনুমোদনও নেই। ফলে ওষুধ উৎপাদনের যে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ থাকে, সেগুলোর আওতায় এসব পণ্য পড়ে না।
সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিজেদের শরীরে পেপটাইড ইনজেকশন নিতে দেখা যাচ্ছে। কেউ দাবি করছেন এতে ত্বক মসৃণ হয়েছে, কারও মতে পেশি শক্তিশালী হয়েছে কিংবা পুরোনো আঘাত দ্রুত সেরে উঠেছে। আবার কেউ বলছেন প্রদাহ কমেছে বা বিপাকক্রিয়া উন্নত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ দাবিগুলোর বেশিরভাগই প্রাণীর ওপর প্রাথমিক গবেষণার ভিত্তিতে। মানুষের ওপর পর্যাপ্ত ও মানসম্মত পরীক্ষা হয়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। কিছু ক্ষেত্রে মাথা ঘোরা, ডায়রিয়া, ত্বকে ফুসকুড়ি ও পায়ে ফোলা দেখা গেছে বলে জানা গেছে।
গবেষণায় আরও ইঙ্গিত মিলেছে, বাজারে থাকা কিছু পণ্যে ব্যাকটেরিয়ার বিষাক্ত উপাদান থাকতে পারে। অল্পমাত্রায় এগুলো জ্বর বা দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে, আর বেশি হলে মারাত্মক সংক্রমণ বা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, নিয়ন্ত্রিত ও অনুমোদিত ওষুধ ব্যবহারের সফলতা অনেককে ইনজেকশন নেওয়ার বিষয়ে মানসিক বাধা কমাতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু সব পেপটাইড একইভাবে নিরাপদ—এমন ধারণা ভুল। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া শরীরে এসব পদার্থ প্রবেশ করানো এক ধরনের জৈবিক ঝুঁকি নেওয়া।
অন্যদিকে কিছু বেসরকারি ক্লিনিক পেপটাইড থেরাপি দিচ্ছে। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকায় অনেক পেপটাইড মানবপর্যায়ের পরীক্ষায় এগোয়নি। যেহেতু অনেক পেপটাইড মানবদেহে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়, তাই সেগুলো পেটেন্ট করা কঠিন—এ কারণে বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখায় না বলে তাদের যুক্তি। তবে তারা স্বীকার করেন, এগুলো অনুমোদিত ওষুধ নয় এবং ব্যবহারে রোগীর পূর্ণ সম্মতি নেওয়া হয়।
ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, গবেষণার নামে পণ্য বিক্রি করে মানবদেহে ব্যবহারের প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। অনুমোদনহীন ওষুধ শরীরে প্রয়োগ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত পণ্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে অজানা দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো প্রস্তুত নয়। সুস্থতার নামে অনিয়ন্ত্রিত পরীক্ষানিরীক্ষা ব্যক্তিগত নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
















