কেনিয়ার লাইকিপিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে নির্মাণাধীন একটি ইবোলা কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপিত এই উদ্যোগ এখন ভূমির মালিকানা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং বিদেশি প্রভাব নিয়ে বিস্তৃত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রকল্পটির বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হয়েছেন। আদালতের নির্দেশে নির্মাণকাজও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, তাদের মতামত উপেক্ষা করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকায় সম্ভাব্য ইবোলা সংক্রমণের সময় আক্রান্ত বা ঝুঁকিতে থাকা মার্কিন নাগরিকদের কোয়ারেন্টিনে রাখার জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি শুধু জনস্বাস্থ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের ভূমি-সংক্রান্ত ক্ষোভ ও বিদেশি প্রভাবের ইতিহাস।
লাইকিপিয়া অঞ্চল কেনিয়ার উপনিবেশিক ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসনামলে এই এলাকার বিস্তীর্ণ উর্বর জমি ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। স্বাধীনতার কয়েক দশক পরও সেই সময়ের অনেক ভূমি মালিকানা কাঠামো বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশ মনে করে, অতীতে যেভাবে তাদের ঐতিহ্যগত চারণভূমি ও জমি বিদেশি স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল, বর্তমান প্রকল্পও সেই স্মৃতিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হওয়া কয়েকটি বিতর্কিত ভূমি চুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে তাদের ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিদ্যমান।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই কারণেই অনেক বাসিন্দা বিদেশি উদ্যোগকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখছেন না; বরং তারা এটিকে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যায়ন করছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রটির উদ্দেশ্য কেবল ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর কারণে কেনিয়াকে উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে বলে তাদের দাবি।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি এটি জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক প্রকল্প হয়, তাহলে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ করা হলো না কেন? অনেকেই অভিযোগ করছেন, প্রকল্পটি মূলত বিদেশি নাগরিকদের সুবিধার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে, অথচ স্থানীয় জনগণের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
সরকারের এক মন্ত্রী সম্প্রতি সংসদে বলেন, জনস্বাস্থ্য আইনের আওতায় এই ধরনের প্রকল্পে জনপরামর্শ বাধ্যতামূলক নয়। তার এই বক্তব্য নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান অনুযায়ী বড় ধরনের সরকারি সিদ্ধান্তে জনসম্পৃক্ততা একটি মৌলিক নীতি। তাই জনগণের মতামত উপেক্ষা করা সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী হতে পারে।
এদিকে প্রকল্পবিরোধী আন্দোলনে নিহত এক কিশোরের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। স্থানীয়দের কাছে সে এখন প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক কেবল একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের প্রশ্ন নয়। এটি এমন এক অঞ্চলের বাস্তবতা তুলে ধরছে, যেখানে উপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, ভূমি বঞ্চনার ইতিহাস এবং বিদেশি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ এখনো গভীরভাবে বিদ্যমান।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে শুরু হওয়া ভূমি ও ক্ষমতার প্রশ্ন আজও লাইকিপিয়ার রাজনীতি ও সমাজকে প্রভাবিত করছে। সাম্প্রতিক এই বিতর্ক সেই অমীমাংসিত ইতিহাসকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
















