যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার পর দেশটি ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময় পার করছে। শুরুর দফার হামলায় সামরিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যা ওয়াশিংটন ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো ভেঙে দেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
শনিবার রাতের মধ্যে খামেনির মৃত্যুর খবর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তেহরানসহ কয়েকটি বড় শহরে সীমিত পরিসরে উচ্ছ্বাসের দৃশ্য দেখা যায়। প্রবাসী ইরানিদের একাংশের মধ্যেও একই প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। অনেকের কাছে এটি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙার সম্ভাব্য মোড় বলে মনে হয়েছে।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও একই সুরে বক্তব্য দেন। তবে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা যতটা সমন্বিত ছিল, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান ততটাই অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
রোববার সকালে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং অস্থায়ীভাবে তিন সদস্যের একটি পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেয়, যারা নির্বাহী দায়িত্ব পালন করবে। সংবিধান অনুযায়ী নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার দায়িত্ব ৮৮ সদস্যের বিশেষ পরিষদের ওপর বর্তায়। তবে প্রার্থীদের অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের প্রভাব থাকায় পুরো প্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
খামেনির জীবদ্দশায় সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে নানা জল্পনা ছিল। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের নামও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলায় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতে ১৯৮৯ সালে খামেনির নিজেই অপ্রত্যাশিতভাবে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার নজির দেখায়, চূড়ান্ত ফলাফল অনুমান করা কঠিন।
সামরিক দিক থেকে ইরান বড় ধাক্কা খেয়েছে। বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তবু প্রথম দুই দিনের মধ্যেই ইরান বিভিন্ন আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। দুবাই ও কুয়েতের বেসামরিক স্থাপনাতেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয় এবং ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলো সরাসরি যুক্ত হয়, তবে তেহরান কূটনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে, ধারাবাহিক সামরিক চাপ ও সম্ভাব্য গণবিক্ষোভ শাসনব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে বিভাজন তৈরি হলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই মুহূর্তে পরিস্থিতি অনিশ্চিত। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হারালেও ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সশস্ত্র বাহিনী এবং পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, সম্ভাব্য বিক্ষোভের গতিপ্রকৃতি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার—এসবের ওপর নির্ভর করবে ইরানের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ।
















