যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর অনেকেই ধারণা করছেন, ইরানে দ্রুত শাসন পরিবর্তন ও কাঠামোগত ভাঙন দেখা দিতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ খুব কম ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল ও মসৃণ রূপান্তর এনে দিয়েছে।
আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার উদাহরণ দেখায়—বাহ্যিক সামরিক অভিযানের পর দ্রুত স্থিতিশীলতা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও সহিংসতার চক্র শুরু হয়েছে। শাসন পরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক ভাঙন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা বহু বছর ধরে স্থায়ী হয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রটি অবশ্য ভিন্ন। দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আদর্শিক। শিয়া ধর্মীয় সংস্কৃতিতে শহীদত্বের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। খামেনির মৃত্যু ‘বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগ’ হিসেবে উপস্থাপিত হলে তা উল্টো জাতীয়তাবাদী সংহতি জোরদার করতে পারে। এতে নিরাপত্তা বাহিনী ও রক্ষণশীল অংশ একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো কতটা অটুট থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, মন্ত্রণালয় ও প্রাদেশিক প্রশাসন যদি কার্যকর থাকে এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের মধ্যে ঐক্য বজায় থাকে, তাহলে লিবিয়ার মতো পূর্ণ ভাঙন এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
তবে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক খুঁজে পাওয়া। জানুয়ারির রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের পর জনগণ ও রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে আস্থার সংকট গভীর হয়েছে। কোনো টেকনোক্র্যাট–সামরিক পরিষদ অন্তর্বর্তী স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করলেও খামেনির মতো ধর্মীয় কর্তৃত্ব তাদের নেই।
যদি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে বা সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়, তাহলে ভাঙন ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। এতে দেশজুড়ে নিরাপত্তাহীনতার চক্র তৈরি হতে পারে।
আরও দুটি বিষয় পরিস্থিতিকে জটিল করতে পারে। প্রথমত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির দুর্বলতা। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় এই শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অথচ রাজনৈতিক রূপান্তরে তারা সাধারণত স্থিতিশীলতার শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাদের অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার শূন্যতা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও জাতিগত বৈচিত্র্য। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সশস্ত্র বিদ্রোহ জোরদার হতে পারে। বড় শহরগুলোতেও স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতার শূন্যতা ঘিরে সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই সংঘর্ষের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
অনেকে যুক্তি দেন, ‘দীর্ঘ কষ্টের চেয়ে তিক্ত সমাপ্তি ভালো’। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখায়, যুদ্ধের ফল সরলরৈখিক নয়; বরং তা প্রায়ই দীর্ঘ ও অনিশ্চিত অস্থিরতার সূচনা করে।
খামেনির মৃত্যু একটি যুগের অবসান নির্দেশ করতে পারে। তবে সেটি অবিলম্বে শাসন পরিবর্তন বা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং সম্ভাবনা রয়েছে—সহিংস বিচ্ছেদের পর ইরান প্রবেশ করতে পারে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ের নতুন অধ্যায়ে, যার প্রভাব শুধু দেশেই নয়, পুরো অঞ্চলে বহু বছর ধরে অনুভূত হতে পারে।
















