শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবদেহ, বিশেষ করে মৃতদেহ, বিজ্ঞানী ও শিল্পীদের অনুপ্রেরণা হয়ে এসেছে। এসব দেহের ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছে সূক্ষ্ম ও নান্দনিক অ্যানাটমিক্যাল চিত্রকর্ম। তবে এই শিল্পকলার পেছনের গল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অন্ধকার ও ভয়াবহ, যা নতুন এক প্রদর্শনীতে সামনে এসেছে।
রেমব্রান্টের ১৬৩২ সালের বিখ্যাত চিত্রকর্মে দেখা যায় এক নিখুঁত মানবদেহ, যেন ধূসর মার্বেলে গড়া কোনো ভাস্কর্য। কিন্তু এই দেহ কোনো পৌরাণিক নায়কের নয়, বরং এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর, যাকে জনসমক্ষে ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে। তার অপরাধ ছিল শীতের একটি কোট চুরি।
যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের থ্যাকরে মিউজিয়াম অব মেডিসিনে অনুষ্ঠিত অ্যানাটমি, আর্ট অ্যান্ড পাওয়ার শীর্ষক প্রদর্শনীতে পাঁচ শতাব্দীজুড়ে তৈরি এমন বহু অ্যানাটমিক্যাল চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব ছবিতে যাদের দেহ দেখানো হয়েছে, তারা অধিকাংশই নামহীন এবং জীবদ্দশায় কিংবা মৃত্যুর পর নিজেদের দেহ এভাবে ব্যবহারের কোনো সম্মতি দেননি।
প্রদর্শনীর কিউরেটররা বলছেন, ইতিহাসজুড়ে যেসব মানুষের অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে, এই দেহগুলো মূলত তাদেরই। দরিদ্র, অপরাধী, নারী কিংবা সমাজের প্রান্তিক মানুষদের দেহ ব্যবহৃত হয়েছে চিকিৎসা ও শিল্পচর্চার জন্য, অথচ তাদের কণ্ঠস্বর ইতিহাসে হারিয়ে গেছে।
ষোড়শ শতকে প্রকাশিত মানবদেহবিষয়ক একটি প্রভাবশালী গ্রন্থের শিরোনাম পাতায় দেখা যায়, এক নারী দেহের প্রকাশ্য ব্যবচ্ছেদ চলছে, দর্শকসারিতে অধিকাংশই পুরুষ। নারীটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন যৌনকর্মী, যিনি শেষ মুহূর্তে গর্ভবতী বলে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন। এই দৃশ্য সামাজিক ক্ষমতা ও বৈষম্যের নগ্ন উদাহরণ বলে মনে করছেন গবেষকরা।
উনিশ শতকে রঙিন মুদ্রণ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অ্যানাটমিক্যাল বইগুলো আরও ব্যয়বহুল ও অলংকৃত হয়ে ওঠে। এসব বই ধনী ব্যক্তিরা নিজেদের শিল্পসংগ্রহের অংশ হিসেবে প্রদর্শন করতেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃতদেহ নিজেই প্রদর্শনীর বস্তু হয়ে ওঠে।
আঠারো শতকে এক নারীর মৃতদেহ সংরক্ষণ করে তার স্বামী নিজ বাড়ির জানালায় প্রদর্শন করেন, নতুন রোগী আকর্ষণের জন্য। এতে সহায়তা করেছিলেন তৎকালীন এক খ্যাতনামা চিকিৎসক। ঘটনাটি সেই সময়ে নারীর দেহের ওপর সামাজিক ও চিকিৎসা কর্তৃত্বের ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
অ্যানাটমি ও শিল্পকলার সম্পর্ক বহু পুরোনো। রেনেসাঁ যুগে শিল্পীরা বাস্তবসম্মত চিত্রের জন্য মৃতদেহ নিয়ে গবেষণা করতেন। তবে সমস্যাটি ছিল দেহ পাওয়া। মৃত্যুদণ্ড কমে যাওয়ায় উনিশ শতকে দেহ চোরদের একটি কালোবাজার গড়ে ওঠে। তারা কবর খুঁড়ে লাশ চুরি করে মেডিকেল স্কুলে বিক্রি করত।
এই পরিস্থিতিতে কিছু পরিবার মৃত স্বজনদের কবর রক্ষায় লোহার খাঁচা বসাত বা ভারী পাথর চাপা দিত। কিন্তু দরিদ্র ও অপরাধীদের ক্ষেত্রে এমন সুরক্ষা ছিল না।
স্কটল্যান্ডে এক সময় দুই ব্যক্তি জীবিত মানুষ হত্যা করে তাদের দেহ চিকিৎসা শিক্ষার জন্য সরবরাহ করত। তাদের একজনের শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড, এবং মৃত্যুর পর তাকেও জনসমক্ষে ব্যবচ্ছেদ করা হয়। তার কঙ্কাল আজও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরে ঝুলছে।
প্রদর্শনীতে এসব দেহের অঙ্কিত চিত্র প্রদর্শনের নৈতিকতা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক অ্যানাটমিক্যাল চিত্রে বিজ্ঞান, শিল্প ও কামনার সীমারেখা মিশে গেছে। আদর্শ শরীরের উপস্থাপনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নান্দনিকতা অনেক সময় নির্মাতাদের রুচি ও সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন।
গবেষকদের মতে, অ্যানাটমিক্যাল চিত্রকে নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক দলিল মনে করা হলেও এগুলোও শিল্পের মতোই সময়, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার প্রভাব বহন করে। এমনকি বিশ শতকেও নাৎসি জার্মানিতে যুদ্ধবন্দীদের দেহ ব্যবচ্ছেদ করে তৈরি করা অ্যানাটমি অ্যাটলাস ব্যবহৃত হয়েছে।
ডিজিটাল যুগে এসে পুরো মানবদেহের থ্রিডি চিত্র তৈরি হয়েছে এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর দেহ থেকে। যদিও তিনি দেহদানের সম্মতি দিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে তার দেহ এভাবে ব্যবহৃত হবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
এই প্রদর্শনী শেষ হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে—এত শতাব্দী পেরিয়ে আসার পর, আমরা আসলে কতটা এগোতে পেরেছি?
















