বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে ফিরে তার প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হবে সংবিধানিক শাসন ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। জি নেটওয়ার্কের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের অভিযোগ তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে আইনহীনতা, দলবদ্ধ সহিংসতা, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, এক লাখ বায়ান্ন হাজারের বেশি মানুষ মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি, যারা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান ব্যবস্থায় দেশের দ্রুত অগ্রসরমান অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে এবং তরুণ, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হয়েছে। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি আঘাতের মুখে পড়েছে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শেখ হাসিনার দাবি, দেশে আইনের শাসনের বদলে দলবদ্ধ সন্ত্রাস কায়েম হয়েছে এবং চরমপন্থি শক্তিকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি ও তারেক রহমান প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধিতা স্বাভাবিক, তবে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও মাঠে উপস্থিত থাকা জরুরি। তারেক রহমান দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে রাজনীতি পরিচালনা করেছেন, যা নেতৃত্বের জন্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি স্বার্থের জন্য চরমপন্থি শক্তির সঙ্গে আপস করে এবং ইতোমধ্যে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা সামনে এসেছে।
ঢাকার একটি আসনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় নিহত শরীফ ওসমান হাদিকে শহীদ হিসেবে তুলে ধরা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের মহিমান্বিতকরণ গভীরভাবে উদ্বেগজনক। তার মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি অভিযোগ করেন, নিরপেক্ষ তদন্তের বদলে সহিংস জনতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
ভারত ও বিএনপির সম্পর্ক বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার প্রতি কূটনৈতিক সৌজন্য দেখানো স্বাভাবিক। তবে ভারতের মূল স্বার্থ হলো বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা। চরমপন্থি সহিংসতা দুই দেশের কারও স্বার্থে নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও পুনর্গঠন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দলটি কোনো একক পরিবারভিত্তিক নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব ও নতুন চিন্তাকে জায়গা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তবে দল নিষিদ্ধ অবস্থায়, নেতাকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হলে প্রকৃত পুনর্গঠন সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গত এক বছর সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, দূর থেকে দেশের অবস্থা দেখা কষ্টকর হলেও তিনি দল ও জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। তার ভাষায়, ভয় ও দমননীতির ওপর দাঁড়িয়ে কোনো শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। শেষ পর্যন্ত জনগণই তাদের দেশ ফিরে পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
















