যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক নেতা, যিনি একদিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রচারক, আবার অন্যদিকে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। মঙ্গলবার তিনি গাজায় হামাসকে অস্ত্র নামাতে হুঁশিয়ারি দিয়ে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন, পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় মাদক চক্রের বিরুদ্ধে নিজের অভিযানে আরও একটি স্পিডবোট ধ্বংসের দাবি করেন।
একই সময়ে, সরকারি অর্থ সংকটের কারণে শত শত ফেডারেল কর্মীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার কথা বললেও তিনি আর্জেন্টিনার জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন—শর্ত ছিল, আর্জেন্টিনার জনগণ যেন তার ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলিকে সমর্থন করে।
এছাড়া ইউক্রেনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার গভীরে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অনুমতি চাওয়ার বিষয়েও ট্রাম্প প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, যা তার পূর্ববর্তী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী এবং রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এইসব কর্মকাণ্ডে অনেকেই বিস্মিত—বিশেষ করে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ সমর্থকরা, যারা ধারণা করেছিলেন ট্রাম্প কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতেই মনোযোগ দেবেন।
ওয়াশিংটনে হাভিয়ের মাইলির সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ এক বক্তৃতায় একের পর এক বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেন—এলিজাবেথ ওয়ারেন ও কমিউনিস্টপন্থী বলে আখ্যা দেওয়া নিউইয়র্কের প্রার্থী জোহরান মামদানিকে আক্রমণ, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিসকে উপহাস, স্পেনের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে সমালোচনা এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে আসন্ন অলিম্পিক নিয়ে গর্ব।
একদিন আগেই তিনি ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি ফেরানোর চুক্তি করিয়ে আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু পরদিনই আবার ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন আর কেবল জাতীয়তাবাদ নয়, ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের দিকেও মনোযোগ দিচ্ছেন। তিনি নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান, যিনি বিশ্বের শক্তিশালী নেতাদের সঙ্গে সমান তালে চলতে পারেন—একই সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং ঐতিহাসিক মর্যাদাও অর্জনের আকাঙ্ক্ষা রাখেন।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে স্পষ্ট আদর্শ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কখনো তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতো কঠোর অবস্থান নেন, আবার কখনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ‘অ্যান্টি-ওয়োক’ রাজনীতির অনুকরণ করেন। বাণিজ্যনীতিতে তিনি পিটার নাভারোর মতো গ্লোবালবিরোধী ভাবধারার অনুসারী। মধ্যপ্রাচ্যে তার কূটনৈতিক উদ্যোগ আবার জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশের প্রথাগত রিপাবলিকান কূটনীতির প্রতিফলন ঘটায়।
ট্রাম্পের নেতৃত্বে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এখন যেন ‘ট্রাম্প ফার্স্ট’-এ রূপ নিচ্ছে। তার নীতিতে ব্যক্তিগত সাফল্য, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও রাজনৈতিক আনুগত্য—সবকিছুই মিশে আছে। গাজা পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও তিনি মানবিক দিকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবেও দেখছেন।
আর্জেন্টিনাকে সহায়তার প্রস্তাবও এই প্রভাব বিস্তারের অংশ। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, দেশটির অর্থনৈতিক পতন লাতিন আমেরিকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এই পদক্ষেপ মাইলির রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতেই নেওয়া হয়েছে। এমন পদক্ষেপ ২০১৯ সালের ইউক্রেন কেলেঙ্কারির স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে, যখন তিনি সামরিক সহায়তার বিনিময়ে রাজনৈতিক সুবিধা চেয়েছিলেন।
মঙ্গলবার সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞেস করলেন, “এই আর্জেন্টিনা সহায়তা কীভাবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?”, তখন ট্রাম্পের উত্তর ছিল অস্পষ্ট।
তবে এই পদক্ষেপ চীনের সঙ্গে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বেইজিং আর্জেন্টিনার তামা, লিথিয়াম ও সয়াবিন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে।
একইভাবে ভেনেজুয়েলায় তথাকথিত মাদকচক্রবিরোধী অভিযানের আড়ালেও অনেকেই দেখছেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা।
ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি ফেরানোয় ট্রাম্পের ভূমিকা অবশ্য ঐতিহ্যগত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের মতো। কিন্তু তিনি যদি গাজায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের দিকে যান, তাহলে সেটা তার ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার’ প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যান্ড্রু মিলার বলেন, “ট্রাম্প সবসময়ই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এড়ানোর কথা বলেছেন। কিন্তু যদি গাজায় মার্কিন সেনা জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা তার মূল সমর্থক গোষ্ঠীর জন্য বড় ধাক্কা হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে তার প্রতিটি বৈদেশিক পদক্ষেপ কেবল আমেরিকার নয়, তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ব্যক্তিগত মর্যাদার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
















